banglanewspaper

বিশেষ প্রতিবেদক: ইটভাটার কার্বন নিঃসরণে দুষিত হচ্ছে পরিবেশ। বায়ুদূষণ, কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয়রে দায় এসব ইট ভাটার। এ অবস্থায় যদি ভাটার অবস্থান কৃষি জমি বা বাগানের পাশে হয় তবে ক্ষতির প্রভাবটা আরও বেশি হয়। 
পরিবেশের কথা বিবেচনা করেই ২০১৩ সালে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। আইনটিতে কোন কোন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ, তা চিহ্নিত করা হয়। তবে এ আইনে ধারা অনুযায়ী দেশের প্রায় সব ইটভাটার অবস্থানই নিষিদ্ধ স্থানে। 
ফলে ঐ সময় এসব ইটভাটা উপযুক্ত স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য আইনটিতে দুই বছর সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আসছে মাসের ৩০ জুন নির্ধারিত এ সময়সীমা শেষ হতে চলছে। ফলে আইনে নিষিদ্ধ  হচ্ছে সেই সব অস্থানান্তরিত ইটভাটাগুলো। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের বেঁধে দেওয়া এ সময়ে দেশের কোন ইট ভাটাই উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর হয়নি। ফলে এসব অবৈধ ইট ভাটার তালিকা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদের  তালিকায় রয়েছে এমন ৬ হাজার ৬৩৭টি ইটভাটা। যা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে দাবী সরকারের এ কতৃপক্ষের। 
উল্লেখ্য, দেশে ইট ভাটার সংখ্যার ২০১৫ সালের তথ্যে ৬ হাজার ৯০০টি। আর প্রতিবছর ইট ভাটা বাড়ে প্রায় ৫০০টি করে। যার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের অবৈধ তালিকাভূক্ত করেছে ৬ হাজার ৬৩৭টি ইটভাটা।
২০১৩ সালেরর ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ এলাকা থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার ও এলজিইডি নির্মিত রাস্তার আধা কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা হতে পারবে না। এখানে নিষিদ্ধ এলাকা বলতে আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, কৃষিজমি, বন, বাগান ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। 
এ অবস্থায় আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমিতে ভাটা স্থাপন করলে পাঁচ বছর কারাদ- ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে আইনে। আর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রেখে ভাটা নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদ- ও ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
২০১৩ সালের ২০ নভে¤॥^র সংসদে ইট প্রস্তুত ও ভাটা নির্মাণ (নিয়ন্ত্রণ) আইনটি পাস হয়। সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হয় ২০১৪ সালের ১ জুলাই। আইনে নিষিদ্ধ স্থানে নতুন করে কোনো ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এছাড়া আইনের ৮-এর ৪ ধারায়, স্থানান্তরের জন্য দুই বছর সময় বেঁধে দেয়া হয়।
এদিকে পরিবেশের বিপর্যয় রক্ষায় ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে কী ব্যবহার হবে আইনে তাও বলা আছে। আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছ, কোনো ব্যক্তি ইট ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কোনো জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে পারবেনা। 
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় সব ইটভাটাই নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে রয়েছে। সারা দেশে প্রায় সাড়ে ছয় হাজারের মধ্যে আইন অনুমোদিত স্থানে রয়েছে মাত্র কয়েকটি ইটভাটা। আর নতুন করে ছাড়পত্র দেয়ার মতো জায়গাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 
তারা জানায় বর্তমানে ভাটা স্থাপন ও ছাড়পত্র নবায়নের জন্য যত আবেদন আসে, পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এর সবগুলোরই অবস্থান নিষিদ্ধ এলাকায়।
এদিকে ভাটা স্থানান্তর বিষয়ে মালিকদের দাবি, সময়সীমা উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও এসব ভাটা পুনরায় স্থাপনের জন্য উপযুক্ত অনুমোদিত জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব আনেন ভাটা মালিকরা। তারা জানান, গত দুই বছরে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেছেন তারা। আইন সংশোধন না হলে বৈঠকে এমনকি তারা ইট উত্পাদন বন্ধ রাখারও হুমকি দেন।
বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সহসভাপতি আসাদুর রহমান খান বলেন, বিদ্যমান এ আইনে নতুন করে ইটভাটা স্থাপনের কোনো সুযোগই থাকছে না। এ অবস্থায় আইনটি এমনভাবে সংশোধন করা উচিত, যাতে করে ইটভাটা স্থাপন ও স্থানান্তরের সুযোগ থাকে।
তিনি আরো বলেন, দেশের চাহিদা পূরণে ইটের প্রধান কাঁচামাল মাটি সুলভ করার বিষয়টিও সংশোধিত আইনে নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এ আইন অনুযায়ী, ৩০ জুনের পর থেকে সেগুলো অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। আইনটি বলবত্ থাকায় এখন নতুন করে আরো সময় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে এসব ভাটা উচ্ছেদের আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকেই যাচ্ছে। ফলে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন মালিকরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আলমগীর (ঢাকা অঞ্চল) এ বিষয়ে বলেন, আইনটি সংশোধনের সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশোধন হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইনটি সংশোধন না হয়, তবে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়বে। আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
 

ট্যাগ: