banglanewspaper

আব্দুম মুনিব, কুষ্টিয়াঃ কুষ্টিয়ায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে চাল মজুদ সিন্ডিকেট চক্র। ধান সংকটের কারন দেখিয়ে চক্রটি একের পর এক বাড়িয়ে চলেছে চালের বাজার। গত দু’মাসে খুচরা বাজারে প্রায় সব রকম চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১২টাকা।

দেশের বাজারে মোটা ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় কপাল খুলেছে জেলার অটো মিল মালিকদের। চিকন ও মিনিকেট ধানের দাম না বাড়লেও মিনিকেট চালের জন্য বিখ্যাত কুষ্টিয়ার এই মোকামে মোটা চালের সাথে তালমিলিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে চিকন চালের দাম। জেলার ২১টি অটো মিল মালিকদের সিন্ডিকেট এই কারশাজির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ করেছে হাসকিন মিল মালিকরা। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি সম্পৃন্ন অস্বীকার করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম খাজানগরের অটো মিল মালিকরা বলছেন ধানের সংকট আর বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে বলেই চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য খুচরা বিক্রেতাদের দাবী ধানের কিছুটা সংকট থাকলেও এই অজুহাতে ইচ্ছেমত দাম হাঁকাচ্ছেন মিলাররা। এতে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে সারা দেশের চালের বাজার। 


দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর। মিনিকেট চালের জন্য বিখ্যাত কুষ্টিয়ার এই মোকাম। এখানকার পাঁচ শতাধিক রাইচ মিলে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টন চাল উৎপাদন হয়। এই মোকামের চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের উপর অনেকাংশেই নির্ভর করে সারা দেশের চালের বাজার।  সম্প্রতি এই মোকামে গিয়ে চালকল মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শেষের দিকে এসে প্রতিবছরই ধানের দাম বৃদ্ধি পায়। সে কারণেই বেড়ে যায় চালের দাম। গত দুইমাসের মধ্যে মোটা ধানের দাম মনপ্রতি ১শ’ টাকার উপরে বেড়েছে। বর্তমানে ধান কিনতে হচ্ছে প্রতিমন ৮শ’ থেকে সাড়ে ৮শ’ টাকায়। দুই মাস আগে এই ধানের দাম ছিল সাড়ে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। 


কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীরা জানান, এখন থেকে দুই মাস আগে খুচরা বাজারে স্বর্ণা জাতের চাল ২৬ টাকা, কাজললতা ৩১ টাকা ও আটাশ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। দুই মাসের ব্যবধানে শুক্রবার একই বাজারে স্বর্ণা ধানের চাল বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৩৫ টাকা, কাজললতা ৪২ টাকা ও আটাশ ৩৯ টাকা দরে। 


তবে সারা দেশে মোটা ধানের দাম বাড়লেও মিনিকেট ধানের দাম খুব বেশি বাড়েনি। গত দুই মাস আগে প্রতিমন মিনিকেট ধান বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৯শ’ টাকায়। বর্তমানে মিনিকেট ধানের বাজার মনপ্রতি ১ হাজার থেকে ১০৫০ টাকা। সে হিসেবে মিনিকেট ধানের দাম খুব একটা বাড়েনি। কিন্তু কুষ্টিয়ার সিন্ডিকেট চক্র সারাদেশে মোটা চালের সাথে তালমিলিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে মিনিকেট চালের দাম। গত দুই মাস আগে কুষ্টিয়ার খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকায়। বর্তমানে সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৭ টাকায়। 

কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সামাদ জানান, সম্প্রতি ধানের দাম বেড়েছে খুব বেশি। যে কারনে চালের বাজারে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই ধানের দামের সাথে চালের দামের সামঞ্জস্য নেই। ধানের দাম বৃদ্ধি’র কারনেই চালের দাম বেড়ে গেছে। 


তবে হাসকিন রাইচ মিল মালিক ও সাধারন ব্যবসায়ীরা জানান, কুষ্টিয়ার অটো রাইচ মিল মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ধান-চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কৃষকের হাতে এখন আর ধান নেই, অধিকাংশই কিনে নিয়েছে ওই সিন্ডিকেট। এখন তারা কি পরিমাণ চাল বাজারে ছাড়বে। আর কি দাম নির্ধারণ করবে তার উপর নির্ভর করছে চালের বাজার। এভাবে চলতে থাকলে কয়েকদিন পর থেকেই ধানের অভাবে বন্ধ হতে থাকবে ছোট আকৃতির চালকলগুলো। 
কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক জয়নাল আবেদিন সাধু বলেন, হাসকিন মিল মালিকদের অভিযোগ অসত্য না। এখানকার ছোট ছোট মিলারদের অবস্থা লাভ না। ইচ্ছা থাকলেও তারা খুব বেশি ধান মজুদ করতে পারে না। আর অটো মিলে প্রচুর ধানের প্রয়োজন হয়। তাই অটো মিল মালিকদের প্রচুর ধান মজুদ করতে হয়। তবে এবছর আমাদের অঞ্চলে পাটের আবাদ বেশি হওয়ার কারনে ধানের আবাদ অনেক কমে গেছে। ফলে মৌসুমের শুরু থেকেই ধানের দাম বেশি। 


কিন্তু অটো মিল মালিকদের দাবী, গুদামজাত করে ব্যবসা করার সুযোগ নাই। কারণ সবাই সীমিত পূঁজি নিয়ে ব্যবসা করে। কোন ব্যবাসায়ীই মজুদ করে লাভবান হতে পারেনা। মজুত করে ব্যবসা করতে হলে যে টাকার মাল আটকা পড়ে থাকে তার ব্যাংক ইন্টারেষ্ট হিসেব করে বাদ দিলে অতিরিক্ত কোন লাভই হয়না। তাছাড়াও মজুদ করে রাখলে মনপ্রতি ৪/৫ কেজি চাল ঘাটতি হয়। হিসেব করে দেখা যায়, মজুদ করে ধান চালের ব্যবসা করলে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি। 


ফ্রেশ এ্যাগ্রো ফুডের স্বত্ত্বাধিকারী ওমর ফারুক জানান, বাজারে ধানের সংকট রয়েছে। তাছাড়া কৃষকের ঘরে যে ধান রয়েছে তা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যার কারনে ধানের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। আর ধানের বাজার বেড়ে যাওয়ায় চালের বাজারও উঠতির দিকেই থাকবে। নতুন ধান না ওঠা পর্যন্ত বাজার নিন্মমুখি হবার সুযোগ নেই। 


কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজার এলাকার পাইকারি চাল ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন জানান, সরকারি খাদ্য গুদামে মোটা চাল কেনা হচ্ছে কেজি প্রতি ৩২ টাকায়। এর প্রভাব বাজারে পড়েছে। কিন্তু দাম বাড়ার সুফল কৃষকেরা পাচ্ছেন না, ভোগ করছেন ব্যবসায়ীরা।


কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য অফিস সুত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় সরকারি ভাবে মিলারদের কাছ থেকে কেজি প্রতি ৩২ টাকা দরে জেলায় চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার মেট্রিক টন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি চাল সংগ্রহ করা হবে সদর উপজেলা থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন। বাঁকি ২ হাজার মে: টন চাল ৫ উপজেলা থেকে ক্রয় করা হবে। পরবর্তিতে মিলারদের কাছ থেকে আরো ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। 


তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন মজুতদার ব্যবসায়ীদের উপর নজরদারি থাকলে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা চালের বাজারও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে আগে দরকার ধান চাল মজুতদারদের সিন্ডিকেট ভাঙ্গা।
 

ট্যাগ: