banglanewspaper

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে তার নিজ গ্রামের বাড়ীর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মুফতি হান্নানের মরদেহবাহী এ্যাম্বুলেন্স ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিনটি গাড়ি তার বাড়িতে পৌঁছায়। এরপর ভোর পৌনে ছয়টার দিকে মুন্সীপাড়া বালিকা মাদ্রাসা ও এতিমখানা ময়দানে তার নামাজের জানাজা পড়ান হরকাতুল জিহাদ (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানের বড় ভাই আলীউজ্জামান। এরপরই তাকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়। ওই হামলায় হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এতে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ তিনজন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর আদালত সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল পাঁচ আসামির মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেন। এরপর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে এ রায় বহাল রাখে। সবশেষ গত ২৭ মার্চ জঙ্গিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। তবে রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন নাকচ করে দিলে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
গোপালগঞ্জে আনন্দ উল্লাস ও মিষ্টি বিতরণ : দেশের শীর্ষ জঙ্গী নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সীর ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার হিরন গ্রামে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করেছে গ্রামবাসী। সেই সাথে তারা আনন্দ উল্লাস প্রকাশ ও মিস্টি বিতরণ করেছে। মুফতি হান্নানের ফাঁসি হয়েছে এমন খবর জানার সাথে সাথে জেলা ছাত্রলীগ জেলা সদরে আনন্দ মিছিল বের করে। এ ছাড়া কোটালীপাড়াসহ জেলার অন্যান্য উপজেলা সদরেও আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মুফতি হান্নানের মতো একজন কুখ্যাত জঙ্গী নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় কোটালীপাড়ার লোকজন আজ কলংক মুক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অনেকে। এদিকে ফাাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় জেলা সদরে আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আনন্দ মিছিল বের করা হয়।

অনেক হামলার মাস্টার মাইন্ড মুফতি হান্নান : মুফতি মো: আব্দুল হান্নান। এক আতঙ্কের নাম ! তার বিরুদ্ধে ১৩ নাশকতার হামলায় ১০১ হত্যা ও ৬০৯ জনকে আহত করার অভিযোগ রয়েছে। এ সব হামলা হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) ব্যানারে হলেও অনেক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন হুজির অন্যতম শীর্ষ এই নেতা। ২০০৪ সালে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়েই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে তার।
এ ছাড়া ২০০১ সালে রমনায় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় হান্নানসহ হুজির আট জঙ্গির মৃত্যুদন্ড দিয়ে ছিলেন আদালত। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন মুফতি হান্নান। তখন থেকেই কারাগারে ছিলেন তিনি।

মুফতি হান্নান বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে পড়াশোনা করে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে পাকিস্তান ভিত্তিক ইসলামিক সংগঠন হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়ে তৎপরতা শুরু করেন। পরে আফগান ফেরত এ দেশীয় মুজাহিদদের সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশে (হুজি-বি) যোগ দেন।  অবশ্য মুফতি হান্নান যোগদানের আগেই হুজি-বি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় হুজির দায়িত্ব পালন কালে তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি নাশকতা মূলক ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুই দফায় হত্যাচেষ্টা ও ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে গ্রেনেড হামলার অভিযোগও রয়েছে। ১৭ মামলার মধ্যে দুটির বিচার শেষ হয়েছে।

মুফতি আব্দুল হান্নানের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় তার জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তিনি গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। এরপর ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে দাওরা হাদিস পড়া কালে ১৯৮৭ সালে ওই দেশের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তানে যান এবং করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহ শাস্ত্রে ভর্তি হন। সেখান অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি পেশোয়ারে কুয়েত আল-হেলাল হাসপাতালে ১০ মাস চিকিৎসা নেন। এরপর আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিরে আসেন এবং লেখাপড়া শেষ করেন।

যে ভাবে মুফতি হান্নানের জঙ্গি কার্যক্রম শুরু : মুফতি হান্নান ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ফেরেন এবং পাকিস্তান ভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীন নামক সংগঠনের হয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি হুজি-বি তে যোগ দেন। অবশ্য এর আগেই আফগান ফেরত এ দেশীয় মুজাহিদরা হুজি-বি গঠন করেন। মুফতি হান্নান দেশে এসে প্রথমে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি হুজির গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার থানা প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। কিন্তু সাংগঠনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা এবং আফগান যোদ্ধার পরিচয় তাকে অল্প দিনের মধ্যে হুজি-বি’র অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে যেতে সহায়তা করে। তবে হুজিতে থাকার পাশাপাশি মুফতি হান্নান হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়েও কার্যক্রম চালাতেন বলে জানা গেছে।

যেভাবে মুফতি হান্নান আলোচনায় এলেন : ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এদেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বি’র নাশকতা শুরু হয়। হুজি-বি’র কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের জবান বন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ঘটনায় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ফলে জঙ্গিদের বিষয়টি তখন আড়ালেই থেকে যায়। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। তাতে আটজন নিহত হন।

২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে প্রথম আলোচনায় আসেন মুফতি হান্নান ও তার দল। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে থেকে তৎপরতা চালান। ২০০১ সালে ঢাকায় সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ ছয়টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা। এরপর শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তার সমাবেশে। এতে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তি। তার আগে ওই বছরের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ৭ আগস্ট সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি-বি’র জঙ্গিরা। হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন।

ঢাকায় আরও সাত মামলা : মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে করা আরও সাতটি মামলার বিচার ঢাকার বিভিন্ন আদালতে চলছে। সে গুলো হলো ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলা, রমনার বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলা, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় দুটি, ২০০১ সালে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দুটি মামলা।

সিলেটে পাঁচ মামলা : মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে সিলেটের আদালতে বিচারাধীন আছে চারটি মামলা। আর একটি মামলা অধিকতর তদন্ত করছে সিআইডি। সেটি হলো সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলা।

নারায়ণগঞ্জ দুই মামলা : ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলা সেখান কার আদালতে বিচারাধীন আছে।

খুলনায় এক মামলা : এ ছাড়া ১৯৯৯ সালে খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলার মামলাটি এক দফা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশে ২০১০ সালে আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। মামলাটি এখন তদন্তাধীন আছে।

অপর চারটি মামলা হলো : ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় করা দুটি মামলা, ২০০১ সালে সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলা এবং একই বছর সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদর উদ্দিন কামরানকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা মামলাও চলমান।

ট্যাগ: