banglanewspaper

এম মতিউর রহমার মামুন: জামাত বি,এন,পি যে, কাজটা কখনো করতে পারেনি তা করতে মরিয়া ওয়াশিংটন। শেখ মুজিব,  ইন্দিরা গান্ধি থেকে এ পর্যন্ত বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত বরাবই আওয়ামী লীগের সঙ্গে তা বলার প্রয়োজন হয়না। সেই সম্পর্ক সেদ বা ফাটল ধরাতে ট্রামকার্ড হিসাবে ব্যাবহার করতে চায় মিলার'কে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  সাহসিকতা বিষয়ক অ্যাওয়ার্ড ফর হিরোইজম পুরস্কার  এবং ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন থেকে  শিল্ড অব ব্রেভারি পুরস্কার পাওয়া  আর্ল রবার্ট মিলার বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ফরাসি, স্প্যানিশ ও ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী। 

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বতসোয়ানায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের স্থলাভিষিক্ত হবেন মিলার। সিনেটের অনুমোদনের পরই মিলারের মনোনয়ন চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে কনসাল জেনারেল ছিলেন  মিলার।

তাছাড়া  নয়া দিল্লি, বাগদাদ ও জাকার্তায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত গ্যাবোর্নে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দায়িত্বও  পালন করেছেন মিলার। সম্পতি গাজীপুরের সিটি নির্বাচনে বি এন, পি প্রার্থীর করুণ পরাজয়ের পর ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের বক্তব্য দেশবাসী খুব ভালো ভাবে মেনে নেয়নি।

খালেদা জিয়ার বক্তব্যই তিনি দিয়েছেন এমন মন্তব্যই করেছেন প্রবীণ রাজনিতীবিদ'রা।  সংগত কারনে বিশ্বব্যাপি তিনি সন্দিহান। আচোলনা সমালোচলার জন্ম দেওয়াতে  তাঁকে নির্বাচনে ব্যাবহার করে ফল পাওয়া যাবেনা তা পরিস্কার। নিয়ম নীতির দিক থেকে তারা যা অতিতে করেছেন  তা ভেবে দেখা দরকার।  ক্ষমতাসীন দল বদলের সঙ্গেই  বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদেরও রদবদল হয়েছে তা স্বাভাবিকতার মধ্যই পরে।  । কিন্তু রিপাবলিক পার্টি ক্ষমতায় আসার পরও ডেমোক্রেটদের দ্বারা বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটকে কিন্তু  এত দিনও  পরিবর্তন করেনাই। 

নির্বাচনের আগের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাষ্ট্রদূত পরিবর্তন থেকেই ধরে নেওয়া যেতে   পারে  বার্নিকাটকে সরিয়ে মিলারকে আনা সাধারণ  কোন  পরিবর্তন নয়। এর গভীরে তলিয়ে দেখা দরকার,  এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো পরিকল্পনার সম্ভাবনা আছে কি না তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন  রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এমন সন্দের কারনও আছে মনে করছেন তাঁরা।  সহযোগি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ' বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় ও অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ গোপন নথি ফাঁসের জন্য বিখ্যাত জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস প্রকাশিত বিভিন্ন নথিপত্রে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকার কথা বারবার উঠে এসেছে'। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে  এ  পরিবর্তন নিশ্চই সন্দেহের বাইরে নয় তার কারণ
আমাদের  রাজনীতিতে সবসময়ই  যুক্তরাষ্ট্র  হস্তক্ষেপ করেছে  তার বহু নজির আছে।

অনলাইনে প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে 'বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বঙ্গবন্ধু হত্যা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে জড়িত, এর প্রমাণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী । এই পরাশক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কিসিঞ্জারের সাবেক স্টাফ অ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিস এক সাক্ষাৎকারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কিসিঞ্জারের ঘৃণার কথা স্বীকার করেছেন।

মরিস জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয় বলে মনে করতেন। এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি'। বিভিন্ন  তথ্য গবেষণায়  এসব উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডেও মার্কিন দূতাবাসের ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি স্নাইডার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বার্তা পাঠিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে। এই সক্রিয়তা মার্কিন দূতাবাস আগেও একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় দেখিয়েছিল।

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়ও রাজনীতিতে মার্কিন দূতাবাস প্রভাব বিস্তার করেছিল। সে সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মিলারের তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল'। এছাড়াও বাংলাদেশের রাজনীতিতে  ওয়ান ইলেভেনের ঘটনায়ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেননা  তখন  ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা তাদের  রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া এ বিউটেনিসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর অভিযোগ আমাদের সবার জানা।

তাঁর বিদায়ের পর জেমস এফ মরিয়ার্টি রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। তিনিও নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিলেন বলে মনে হয়না। এমন কি  ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে  চারদলীয় জোট সরকারের ওপর নজর রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। তার কারণ  প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁর সরকারের প্রভাবশালী ১৭ ব্যক্তি সম্পর্কে ২০০৫ সালের ১১ মে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাসের ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি মূল্যায়ন থেকে। সেখানে বলা হয়েছে, বেগম জিয়া সরকারের ঘনিষ্ঠ এমন প্রভাবশালী ১৭ জনের মধ্যে ১২ জনের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া জামাত নেতা নিজামী মার্কিন সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন বলেও জানা গেছে তার বার্তায়। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকসই ওই নথিটি ফাঁস করে। 

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কলকাঠি নাড়বে তা  স্বাভাবিক। আর বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র   ভারতের সহযোগিতা পেলে তো তাদের আর কথায় নেই।  তাই ইতিপূর্বে ভারতে কাজ করা মিলারকে দিয়ে যদি সেই কাজ  টা করাতে চায় ওয়াসিংটন। কিন্তু তা যে এত সহজ হবেনা তাও পরিস্কার কারণ শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্রমুদি সম্পর্ক ভালো। আর নরেন্দ্রমুদি কোন মতেই চাইবেনা ওয়াশিংটনের দ্বার প্রভাবিত হতে। যদিও বর্তমানে 
নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তা অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে এর বাইরে আলাদা কিছু নয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।  তাঁরা আরও মনে করছেন 

মিলার আগে নয়াদিল্লিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাঁর জানাশোনা ও প্রভাব বেশ ভালো রকমই আছে তা কাজে লাগিয়ে যদি সামনের নির্বাচনে কিছুটা কাজে লাগানো যায় তা হবে তাদের বড় পাওনা,  যে কাজটা করতে পারেনি  মার্শা বার্নিকাট। কেননা ভারতের সঙ্গে তাঁর কোন জানাশোনা ছিলনাা। ভারতের কূটনীতি এখন অনেক শক্তিশালী। এই কূটনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যার্থ ছিল  বার্নিকাট।

বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যা চায় তা ভারত মেনে নেয়নি অতিতে। বিধায় ভারত কে কব্জা করতে না পারলে তাদের চাওয়া বুমেরাং হতে তা ওয়াশিংটন ভালো করেই জানেন, বুঝেন তাই তারা চাইবে মিলার কে ব্যাবহার করে ভারত কে হাতে নিতে।  তাই হয়তো মিলারকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।

সংগত করণে ধরে নেওয়া যেতে পারে ভারতের সঙ্গে একটি ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার একটি উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। মিলার'কে বাংলাদেশে তাদের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মধ্য তা কিন্তু এখন সুস্পষ্ট  হল। 

লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper বাংলাদেশ