banglanewspaper

শেখ রাকিবুল হাসান রবিন: বাংলাদেশে এমন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার কোনো হল নেই। বলছি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো আবাসিক হল। তবে জবি ক্যম্পাসের পাশেই বাংলাবাজারে নির্মিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি আবাসিক হল নির্মাণ। হল ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবাসন সঙ্কট নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী তার পড়াশুনা সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে পারছে না। আবাসন সঙ্কট, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক সঙ্কটসহ হাজারও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ছাত্রী হলের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই রিপোর্ট। 

প্রশাসনের প্রথম পদক্ষেপঃ

২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট জায়গাটিতে ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব’ ছাত্রী হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ওইদিন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বৈঠকে এক হাজার ছাত্রীর আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০তলা ফাউন্ডেশনের দুটি টাওয়ার নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ২০তলা ভিত্তির উপর ১৬তলা ভবনের এ হলটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর। এটি বাস্তবায়ন করার দায়িত্বে রয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল দফতর। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারিতে। যার মেয়াদ ছিল ২০১৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। 

দখলদারিত্বের কবলে ছাত্রীহলঃ

প্রশাসনের উদ্যোগে হলের পরিকল্পনা পাশ হলেও কাজ শুরু করতে পারেনি দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণ। স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে যায় জবি ছাত্রীহলের জমিটুকু। সেখানে চলে তাদের বিভিন্ন ব্যবসা।

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জমি উদ্ধারঃ

তখন ২০১২ সাল। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ৯ তারিখ সকাল বেলা শান্ত চত্বরে জড়ো হতে লাগলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দামাল ছেলেরা। জবি ছাত্রলীগের তৎকালীন আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আকন্দের নেতৃত্বে ৩/১, লিয়াকত এভিনিউয়ের দিকে এগিয়ে চলে শতাধিক ছাত্রলীগ কর্মী। প্রায় ২৩ কাঠা জমির অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নিজেদের জায়গা ছিনিয়ে নেয় জবি শিক্ষার্থীরা। সেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর চোখে মুখে ছিল স্বাধীনতার আনন্দ। এরপর শিক্ষার্থীরা সেদিনই সেখানে ছাত্রী হলের ব্যানার টাঙিয়ে দেয়। দখল হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীহলের জমি। 

ছাত্রীহলে যা যা থাকছেঃ

ভবনটিতে কক্ষ থাকবে ১১১টি । এছাড়াও থাকবে পড়াশুনার জন্য একটি লাইব্রেরি, উন্নত খাবারসমৃদ্ধ একটি ক্যান্টিন, একটি ডাইনিং। অন্যদিকে প্রতিতলায় সাতটি করে টয়লেট, আটটি গোসলখানা থাকবে। ১৬ তলা এই হলে ছাত্রীদের ওঠানামার সুবিধার্থে চারটি লিফট রাখার কথা রয়েছে। 

প্রশাসনের দ্বিতীয় পদক্ষেপঃ

জমি দখল করতেই প্রায় বেশীরভাগ সময় চলে গিয়েছিল এই হল নির্মানে। তাই নির্ধারিত সময়ে হয়ে ওঠেনি কাঙ্খিত ছাত্রীহলের চোখে পড়ার মতো কোনো কাজ। এমন পরিস্থিতিতে আরো  সময় চায় প্রশাসন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তাই মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করে সরকার।

প্রশাসনের উদাসীনতাঃ

এবার জায়গা জমি নিয়ে সমস্যা না থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখা যায় ঢিলে ঢালা মনোভাব। সময় পেরিয়ে যায়, অথচ ছাত্রীহলের কোনো কাজ দৃষ্টিগোচর হয় না। ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেখা যায়, কেবল বেসমেন্টের কাজ হয়েছে। এখনো একতলাও তুলতে পারেনি মোঃ ওয়াহিদ মিয়া নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি।

প্রশাসনের শেষ পদক্ষেপঃ

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো কাজের বাস্তবায়ন মেয়াদ দুই বারের বেশি বৃদ্ধির সুযোগ না থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ বিবেচনায় এ প্রকল্পটি তৃতীয়বারের মতো বৃদ্ধি করা যায়। ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি সম্পন্ন না হওয়ায় বিশেষ শর্তে আবার মেয়াদ ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। পরপর তিনবার সময় বৃদ্ধি করে প্রকল্পটি আবার চালু করা হয়। 

ছাত্রীহলের সর্বশেষ অবস্থাঃ

২০১৮ সালের জুন মাস শেষে ছাত্রীহলের ১৬ তলার ছাদ ঢালাই সম্পুর্ণ হয়। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি পুরো কাজ। হলের বিভিন্ন জায়গায় পাইপ লাগানো বাকি। এখনো জানালা-দরজা লাগানো হয়নি বেশীরভাগ রুমেই। সর্বোপরি, এই হল এখনো ছাত্রীদের থাকার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠেনি।

সাধারন শিক্ষার্থীদের মতামতঃ

অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১১তম ব্যাচের ছাত্র এ এস এম আইয়ুব তুহিন বলেন, "হলের কাজ চলছে তবে এতোদিন লাগার কথা না।  এতে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের অবশ্যই গাফিলতি রয়েছে। যতো দ্রুত সম্ভব হলের কাজ শেষ করতে হবে, আর  হল চালু হলে রাজনিতি আরো চাংগা হয়ে উঠবে। অন্যদিকে ছাত্রী দেরও দুরভগ কমবে।"

পরিসংখ্যান বিভাগের ১২তম ব্যাচের ছাত্র আশিক ইসলাম বলেন, "হল নির্মানের এই অনগ্রসরতায় বুঝা যায় যে, নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতটা বেপরোয়া। তারা মোটেও শিক্ষার্থীদের কষ্ট বুঝে না। হলের কাজ এখনো কেন শেষ হচ্ছে না তা আমরা একদমই বুঝতে পারছি না। আমরা চাই মেয়েদের এই হলের কাজ যেন দ্রুত শেষ হয়।

 

ছাত্রলীগের বক্তব্যঃ

তিন মেয়াদেও শেষ হচ্ছে না জবি ছাত্রী হলের কাজ। এই ব্যাপারে  জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল বলেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা আশে পাশের এলাকায় অনেক কষ্ট করে থাকে। আমরা প্রশাসনকে বারবার বলে এসেছি যাতে করে এই জুনেই মেয়েরা হলে উঠতে পারে। কিন্তু এই জুনে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন মেয়েরা হলে উঠতে পারছে না, সে ব্যাপারে আমরা সন্দিহান। এখন এর পেছনে ঠিকাদারী  প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নাকি প্রশাসনের ব্যর্থতা তা আমরা বুঝতে পারছিনা। তবে আমরা প্রশাসনের কাছে দাবী রেখেছি, আগামী জানুয়ারিতেই যেন মেয়েরা হলে উঠতে পারে। 

দায়িত্বরত ব্যক্তিদের মতামতঃ

হল নির্মাণে দায়িত্বরত কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার জিল্লুর রহমান বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, "২০১৮ সালের শেষের দিকে এর কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। যদিও এবছরেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভবনের কাজ করার জন্য আশপাশে যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন সেই পরিমাণ পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই একপাশ থেকেই কাজ চালাতে হয়।  ফলে সময় বেড়েছে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান বলেন, "হল বিষয়ে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। এ বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীই ভালো বলতে পারেন। আমরা বিভিন্ন সময় তাদের চাপ দিয়েছি কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে।"

শিক্ষা অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী শামসুল আলম বলেন, "কাজ দেরি হওয়ার জন্য শুধু আমরা দায়ী নই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে দিতে দেরি করেছে। এ ছাড়া ভবনের কাজ করার জন্য আশপাশে যে পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন, সেই পরিমাণ জায়গা নেই। চলতি মাসেই ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হবে। আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যে কাজটি শেষ করতে পারব।" 

ট্যাগ: Banglanewspaper জবি ছাত্রীহল