banglanewspaper

সাধারণ অর্থে কোরবানি বলতে আমরা মনের পশুত্বকে দূর করা ও পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে প্রিয়তম বস্তুর উৎসর্গকেই বুঝি। কোরবানিকে ত্যাগও বলা হয়ে থাকে। মূলত কোরবানি শব্দটি উর্দু হলেও বাংলা ভাষায় এটি বহুল ব্যবহৃত। আরবি পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘নুসুক’ এবং ইংরেজিতে কোরবানি বলতে ‘সেক্রিফাইস’ বোঝায়। 

কোরবানির উৎসর্গ বা ত্যাগ হতে পারে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। জান, মাল, স্বার্থ, ইচ্ছা-ইরাদা যেকোনো জিনিস কোরবানি বা উৎসর্গ করা যেতে পারে। তবে ইসলামি শরিয়তের ভাষায় কোরবানি ব্যাপকভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করা বুঝায়। ত্যাগ এবং তিতিক্ষা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং উচ্চমানসম্পন্ন ইবাদত। 

আর এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগের বস্তু হচ্ছে- জীবন এবং তার পরই সম্পদের স্থান। কোরবানির গুরুত্ব এবং মহত্ত্ব তখনই সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে যখন তা অত্যন্ত প্রাণপ্রিয় কোনো কিছুকে শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থভাবে উৎসর্গ করা হয়।

ইসলামি শরিয়ায় মুসলমান জাতির জীবনটাই একটি কোরবানিতুল্য। সূরা আল আনামের ১৬২ নম্বর আয়াতে মুসলিম জীবনের আদর্শকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয় আমার নামাজ,আমার আত্মত্যাগ (কোরবানি), আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য’।

ইসলামে আল্লাহ মুসলমানদের মধ্যে তাদের মুসলমান নাম ধারণ এবং আল্লাহর প্রতি ইমানের পরীক্ষার জন্যই কোরবানির মতো একটি কাজকে ইবাদত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মুসলমান শব্দটির অর্থ যেহেতু আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী হিসেবে বোঝায়, তাই আল্লাহপাক মুসলমানদের তাদের ঈমানের পরীক্ষার জন্যই সূরা আনকাবুতের প্রথমেই বলেছেন ‘তাদের কি পরীক্ষা ছাড়া এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে?’

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চান সবাই। কিন্তু প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ না করতে পারলে তা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। সূরা আল ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে ‘তোমরা কখনোই পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মমতার জিনিস আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’

কোরবানির শুরুর ইতিহাস: আল্লাহর খলিল হজরত ইব্রাহিম আঃ স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় ধৈর্যশীল পুত্র (হজরত ইসমাইল আঃ)-কে জবাই করছেন (সূরা সাফফাতের ১০২ নম্বর আয়াতে এ স্বপ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)। হজরত ইব্রাহিম আঃ-এর এই স্বপ্ন প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর আদেশ না হলেও পরোক্ষভাবে এবং বাস্তবে তা ছিল আল্লাহপাকেরই হজরত ইব্রাহীম আঃ-এর প্রতি এক পরীক্ষামূলক নির্দেশ। সূরা আস্‌-সাফফাতের ১০৬ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা’।

অসীম ধৈর্যশীল পুত্র এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত পিতা ইব্রাহিম আঃ আল্লাহ কর্তৃক প্রদর্শিত স্বপ্নের আদেশের প্রতি যখন সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলেন এবং হজরত ইব্রাহিম পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে দিলেন তখনই মহান আল্লাহপাক তার মহা কুদরতি ক্ষমতা বলে ইব্রাহিম আঃ-এর উৎসর্গকে (কোরবানিকে) এক পশু কোরবানিতে রূপান্তরিত করে দিলেন। আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে সূরা সাফ্‌ফাতের ১০৭-১০৮ নম্বর আয়াতদ্বয়ে এই রূপান্তরিত কোরবানিকে এইভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘আর আমরা একটি পশু জবাইয়ের বিনিময়ে তার পুত্রকে জবাই করা থেকে এক মহৎ কোরবানিতে পূর্ণ করলাম এবং এইভাবে পরবর্তী মানুষের জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে কোরবানির শিক্ষাকে প্রচলিত রাখলাম।’

কুরআনের এই আয়াতদ্বয় দ্বারা পশু কোরবানি মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব হয়ে রইল। (আরো বিস্তারিত সূরা হজে বর্ণিত আছে)। যেহেতু জীবন উৎসর্গ করে কোরবানি দেয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ, তাই আল্লাহ সোবহানতায়ালা পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের এই ইবাদতকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাওসারেও আল্লাহপাক নবী করিম সাঃ-কে কোরবানির পরামর্শ দিয়েছেন।

কোরবানি কেন: আমরা অনেকেই কোরবানি দিয়ে থাকলে এর যথার্থ কারণ কিংবা কোরবানি কেন দেয়া হয় সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখি না। এই কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি মানুষের তাকওয়া, কর্তব্যপরায়ণতা, আনুগত্য এবং ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। 

সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক উল্লেখ করেছেন ‘এই পশু কোরবানির রক্ত এবং গোশত কিছুই আমার কাছে উপনীত হয় না, শুধু উপনীত হয় তোমাদের অন্তরের তাকওয়া,সদিচ্ছা এবং আমার আদেশের প্রতি তোমাদের আনুগত্য’।

প্রকৃতপক্ষে কোরবানি হচ্ছে আত্মত্যাগ, স্বার্থ ত্যাগ, সম্পদ ত্যাগ এবং সর্বোপরি জীবন ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভ। যারা এরূপ ত্যাগ স্বীকার করবে তাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। পাশাপাশি আল্লাহ সমগ্র কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে জান্নাতের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সূরা তওবার ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলে দিলেন ‘কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এটিই চরম সাফল্য’।

দুয়ারে কড়া নাড়ছে খুশির ঈদ। কোরবানির ঈদ। এই ঈদে দেশের প্রতিটি প্রান্তেই মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা পশু কোরবানি দেবেন। আপনার কোরবানি তখনই হালাল হবে যদি আপনি আত্মসমর্পণকারী হন। বাজার থেকে পশু কিনে এনে জবাই করলেই কোরবানি হয়ে যাবে না। আপনার, আমার মাঝে কোরবানিতে কতটুকু প্রাণপ্রিয়তা আছে, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে কতটুকু আত্মত্যাগের অভিপ্রায় আছে সেটি প্রধান বিবেচ্য। 

আর কোরবানির পশু নিয়ে যারা অহংকার করেন, যারা উচ্চমূল্যের পশু ক্রয়ের প্রতিযোগিতায় লোক দেখানো কোরবানি দেন তাদের কোরবানি হালাল হবে না। অতএব কোরবানির মাহাত্ম্যকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হলে নিজেকে আগে সংযমী, ত্যাগী, নিরহংকা ও আত্মোৎসর্গকারী করুন। তবেই আপনার কোরবানিতে মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ হবে। তথ্যসূত্র: ওয়েবসাইট
 

ট্যাগ: banglanewspaper কোরবানি