banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার: সেদিন ১৪ আগষ্ট রাজধানী ঢাকার একটি রাত। তখন প্রায় ৯টা বাজে। বার্তাকক্ষের কাজ শেষে বাসায় ফিরেছি। তখন ধানমন্ডির কলাবাগান থানা সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম।

সারাদিনের কাঠফাঁটা গরম শেষে উত্তপ্ত শহর পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত দেহ নিয়ে রাতে বাসায় ফিরে দেখি পানির সরবরাহ বন্ধ। যা মাঝে মাঝে হয়ে থাকে। গ্যাস ও পানির সংকট সে শহরের নিত্যদিনের দুর্ভোগ। পানি না থাকার কারণে কাজের খালাও রান্না না করে চলে গেছে। পানি না থাকার ভোগান্তি আর অন্যদিকে খাবার রান্না হয়নি। মন একদম খারাপ হয়ে গেল। ভাবছি বাইরে খেতে যাবো।

পকেটে তেমন টাকাও নেই যে বাইরে গিয়ে খুব ভালো করে ক্ষুদা মিটানো যাবে। তাও একদম ক্ষুদার্থ থাকার চেয়ে সামর্থ অনুযায়ী খেয়ে রাত কাটানো শ্রেয় মনে করলাম। এরপর বের হলাম খাবারের সন্ধানে। কাল সকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। তাই চারদিক থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সময়ে দেয়া তার বক্তব্য গুলো ভেসে আসছে।

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ , ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, এদের মানুষের মুক্তি চাই’ ইত্যাদি।

সারাদেশে তার মৃত্যুর দিবসে শোক দিবস পালন করবে মুজিব ভক্তরা। মুজিবের সমাধিতে ব্যয়বহুল ফুলের স্তুপ পড়ে যাবে, দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ হবে, আরো কতো কর্মসূচি পালিত হবে। বাসার অদূরে গিয়েই একটি পাতি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। যেসব ধরণের হোটেলে খুব স্বল্পমূল্যে খাবার পাওয়া যায়। হোটেলের সেবায় নিয়োজিতদের সস্তার মধ্যে খাবার দিতে বলে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

হঠাৎ হোটেলের ম্যানেজারের ডেস্কের সামনেই দু’জন বাড়িবাড়ি করছে। সেদিকে একটু মনোযোগ দিয়ে বোঝলাম ৫ টাকার নিয়ে ঝগড়া চলছে। হোটেলে একটি ডিম ও সাথে একটু ঝোলের মূল্য ২০ টাকা। জানতে পারলাম, লোকটি তার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ডিম না খেয়ে শুধু ঝোল দিয়েই খেয়ে নিয়েছে। তাই ৫ টাকা কম রাখতে হোটেল কতৃপক্ষের সাথে ভাগবিতন্ডা হচ্ছে। কিন্তু হোটেল কতৃপক্ষ এ ৫ টাকা কম রাখতেও নারাজ। কোন অবস্থাতেই তার লোকটিকে ৫ টাকা ছাড় দিতে রাজি নয়। পুরো ২০ টাকাই রেখে দিল।

সাথে সাথে লোকটির হৃদয়ের অসহায়ত্ব চেহারায়ও ভেসে উঠলো। তখনও চারদিকে মুজিবের বক্তব্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা , এ দেশের মানুষের মুক্তি চাই’। তার এ বক্তব্য আরো ৪৭ বছর পূর্বের। কিন্তু এতো বছর পরও এ লোকটির ৫ টাকা থেকে মুক্তি মিলেনি।

শুধু সে কেন? আমরাও তো অর্থনৈতিক সংকট, প্রাণখুলে কথা বলা ও চলার স্বাধীনতার সংকট, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহসের সংকটের মুখোমুখি হয়ে, এবং বেকারত্বেও কষাঘাতে প্রাণহীন বিদ্ধস্ত জীবনযাপন করছি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে যুগে ৫০ টাকায়ও একজন লোকের একবেলার খাবার মিলেনা, এককেজি মধ্যমমানের চালের দাম বাজারে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, একটি ডিমের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা তখন কতটুকু সীমাবদ্ধতায় জীবনযাপন করলে কেউ ৫ টাকা থেকে মুক্তি চায়।

এরপর আসহায় লোকটির পক্ষে আমরা উপস্থিত আমরা ক’জনও আওয়াজ তুললাম। পরে হোটেল কতৃপক্ষ তার না খাওয়া ডিমটি তার হাতে তুলে দিল। তবুও ৫ টাকা তারা রেখেই দিল। পরে লোকটি ৫ টাকার বদলে হাতে ডিমটি নিয়েই সে হোটেল ত্যাগ করলো। একটু আগে যে ৫ টাকার জন্য সে ডিমটিই ত্যাগ করেছিল। এরপর আমিও একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম।

এ লোটির মতো আরো কত কোটি লোক যে এমন সীমাবদ্ধতার অভিশাপে জীবনযাপন করছে। আর কত বছর গেলে, আর কতবার মুক্তি পেলে, আর কতো স্বাধীনতার সংগ্রাম হলে আমাদের জীবনে এমন সীমাবদ্ধতার অভিশাপ গুলোর নিরসন হবে।

লেখক: কবি ও উপ সম্পাদক

দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: Banglanewspaper ধানমন্ডি হোটেল