banglanewspaper

পৃথিবীর ইতিহাস রোহিঙ্গা নামের অধ্যায়ে স্মরণ করিয়ে দেয় অতীত বর্তমানের অনেক কথা। রোহিঙ্গা চরম আবেগের নাম।ভাললোবাসার নাম।তালা লাগানো বিবেকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে জাগ্রত প্রতিবাদী রক্তচক্ষু করার নাম রোহিঙ্গা।হ্যা আমি আরাকানবাসী সেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের কথাই বলছি।যারা নিজ জন্মভূমিতে পরবাসী থেকে আজ পরদেশে শরণার্থী। 

প্রাচীন বার্মার ( মায়ানমার) আরাকানে(রাখাইন) ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আরবদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌছে। ফলে রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই মুসলমান।আরাকানদের খুব প্রসিদ্ধ সমুদ্রবন্দর ছিল আকিয়াব। যে বন্দরের পথ ধরে শুধু আরবরা নয় বহু জাতির মানুষ আরাকানে ভিড় জমাতো।আরাকানি মেয়েদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হত। ফলে বহু জাতির সংমিশ্রণে গঠিত আরাকানিরা। সেদিকে ইঙ্গিত করে মহাকবি আলাওল তাঁর পদ্মাবতী কাব্যে লিখেছেন...

নানা দেশে নানা লোক-শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ
      আইসেন্ত নৃপ ছায়াতল।। 
আরবী মিশরী শাসী তরকি হাবশী রুমী
      খোরাসানী উদ্বেগ সকল।। 
লাহুরী মুলতানী সিন্ধী-কাষ্মিরী দক্ষিণি হিন্দী
        কামরূপী আর বঙ্গ দেশী।। 
বঙ্গ শেখ সৈয়দ জাদা মোগল পাঠান যোদ্ধা
         রাজপুত হিন্দু নানা জাতি।। 


আজ সেই আরাকানিদের ভিটেমাটি থেকে সর্বশান্ত করেছে উড়ে এসে জুড়ে বসা বৌদ্ধ বর্মীরা।সম্প্রতি ২৫ আগষ্ট '১৭ মানবতার সমস্ত স্তর লঙ্ঘন করে বিশ্ববিবেক কে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিধনযজ্ঞ শুরু করে মায়ানমারের অহিংসা পরম ধর্মের অনুসারীরা!! রোহিঙ্গাদের শত শত লাশের সাক্ষী হয়েছে নাফ নদী। মানবতা ভেসেছে নাফ নদীতে। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ,শিশু, স্বামী - সন্তানহারা,সম্ভ্রমহারা পরিবারহারা,প্রতিবেশি হারা মাজলুম।তাঁদের রোনাজারিতে আজ আকাশ বাতাশ ভারি হয়ে উঠেছে। 

আমরা তাঁদের আশ্রয় দিয়েছি। আজ তাঁরা আমাদের মেহমান।কিন্তু আমরা তো তাঁদের মাথা কিনে নিই নি।বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলাম মেহমান হিসেবে তাঁরা আমাদের গালির পাত্র কি??? শুরুতেই বলেছি রোহিঙ্গা ভালোবাসার নাম।কিন্তু অত্যান্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ বাঙালির শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছাত্র-শিক্ষক,ছোট-বড়, রিকশাচালক ভ্যানচালকসহ প্রায় সকল স্তরের মানুষের মুখে রোহিঙ্গা যেন একটা গালি!! একজন অপরজনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে গালির মত ব্যবহার করে বলছে, "তুই তো রোহিঙ্গা "। তাচ্ছিল্যের স্বরে একজন অপরজনকে সম্নোধন করছে, "কিরে রোহিঙ্গা!! " 


রোহিঙ্গা নামটি কেন তাচ্ছিল্যের হবে?? কেন বিকৃত করা হবে গালির অর্থে?? এরাই তাঁরা যাদের পূর্ব পুরুষদের শাসনামলে রাজসভার কবি ছিলেন শাহ মহান্মদ সগীর,শাহ আবদুল হাকিম, মহাকবি আলাওলের মত কবি সাহিত্যিকরা।আরাকানে তাঁরা সাহিত্যচর্চা করেছিল বলেই বাংলা সাহিত্য আজ সমৃদ্ধ। আমরা তাঁদের কাছে ঋণী। আজ তাঁদের ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ পেয়ে আমরা গালি দিচ্ছি।সহানুভূতির হৃদয়কে স্বার্থপরের মত কঠোর করে রক্তচক্ষে বলছি "শালা রোহিঙ্গারা এসেছে!! "

হাজার হোক আমরা বাঙালি বলে কথা। অতীত ভুলে গেছি। একদিন আমরাও তাঁদের মত উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম।আমরাও পিতা হয়ে চোখের সামনে ধর্ষিত হতে দেখেছিলাম স্ত্রী-কণ্যাকে,মা হয়ে সন্তানের লাশ দেখে বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম। অথচ আমরা সেদিনের কথা ভুলে গেছি।আমাদের নাক থেকে উবে গেছে অত্যাচারীর খড়গ হস্তে হৃত হওয়া স্বজনদের গলিত শবের গন্ধ।তাই সমব্যাথি হওয়ার বদলে নাক উঁচা করে রোহিঙ্গা গন্ধ শুকছি। অথচ আমাদের মতই তাঁরাও পিছনে রেখে এসেছে আত্নীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশীর,রাইফেলের গুলিতে,চাপাতির আঘাতে,ধর্ষিত হয়ে মরা কিংবা জীবন্ত পুড়তে দেখা শত সহস্র লাশের বিভোৎস সারি।শোকে মূহ্যমান হয়ে জীবনের সমস্ত শক্তিকে হারিয়ে তাঁরা আজ অসহায়, নির্যাতিত নিপীড়িত। 


মায়ানমার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশ। আরাকান আর বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুপ্রাচীন এবং তাঁরা মুসলিম ভাই হওয়ায় রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে শরণার্থী। এবং  এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মানবতার কথা হল তাঁরা মানুষ। তাই আসুন আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করি। কিছু দিতে না পারলেও অন্তত রোহিঙ্গা গালি না দিয়ে রোহিঙ্গা ভাই বলতে অভ্যস্ত হই।


লেখক: আব্দুর রউফ সালাফী, বি এ (অনার্স), ৩য় বর্ষ, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: banglanewspaper রোহিঙ্গা