banglanewspaper

সাজ্জাদ সাজু: স্কুল জীবনের প্রথম যে শিক্ষকের কথা খুব মনে পড়ে, তাঁর নাম ছিল সাজ্জাদ স্যার। অসাধারণ স্মার্ট, সুন্দর পরিস্কার হাতের লেখা। গণিত পড়াতেন স্যার। এমন সুন্দর গণিত স্যার বুঝাতেন ১০০ তে ১০০ না পেয়ে উপায় থাকতনা।একবার ক্লাস ফোরে গণিতে ৯৯ পেয়েছিলাম জন্য স্যার আমার শরীর থেকে শার্ট খুলে ৫টা বেত আনিয়েছিলেন দপ্তরীকে দিয়ে এবং আমার বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।না, সেদিন অবশ্য বেত তিনি চালাননি শুধু ভয় দেখিয়েছিলেন মাত্র।

স্যারের একটা সিডিআই ১০০ মোটরসাইকেল ছিল। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে তাঁর মোটরসাইকেলে করে বাসায় পৌঁছে দিতেন, স্যারের কোমরে হাত রেখে যখন বাড়ি ফিরতাম ভয় আর আনন্দ মাখা একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতো।পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার সংবাদটা স্যার নিজে আমাকে জানিয়েছিলেন। সেদিন স্যারের চোখে মুখে আমি আনন্দ অশ্রু দেখেছিলাম। পিলে চমকানো ভয় পাওয়া রাগী স্যার সেদিন কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলেছিলেন, “তুই একদিন অনেক বড় হবি”।

স্যার আমার সামনে আমার প্রশংসা করতেন না, কিন্তু আমার অগোচরে তিনি আমার বেশ প্রশংসা করতেন যেটা বাবা আমাকে জানাতেন। আমাদের দু’জন গণিত শিক্ষক ছিলেন, একজনের মেয়ে অন্য স্কুলে আমাদের ক্লাসে পড়ত।বিজয় দিবস ও এলাকার বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বিশেষ ইভেন্ট থাকতো, সেটা হল - অংক দৌড়। স্যারের মেয়ের গণিতের পারঙ্গমতা আমাদের কানের জন্য টর্চার ছিল।আমার এক বন্ধুর সাথে সেও এসেছে অংক দৌড়ে অংশ নিতে।মাইকে গণিত স্যার ঘোষণা দিয়েছেন অংক দৌড়ে শুধুই ফাস্ট প্রাইজ থাকবে।এবার স্যারের মেয়ে এসে বলল, “তুমি সাজু”? সেদিন জানলাম এতদিন যার অংকের পারঙ্গমতা সম্পর্কে কান ঝালাপালা হয়েছে এই সেই বালিকা। সেও জানালো আমার অংকে ১০০ পাওয়াটা তার জন্য কতটা টর্চার ছিল।সে বলল, “এবার অংক দৌড়ে তুমি ফার্স্ট হবে।” আমি বললাম কি করে জানলে? সে জবাব দিল, অংক একসাথেই করে ফেলব কিন্তু আমি মেয়ে বলে দৌড়াতে পারবনা তোমার সাথে। আমি তাকে নিশ্চয়তা দিলাম আমি দৌড়াবনা হেঁটেই যাব।আমি অংক করে হেঁটেই গিয়েছিলাম, কিন্তু পেছনে কাউকে দৌড়াতে দেখিনি।ফার্স্ট হয়েছিলাম সেবার।তার আগে ও পরে অনেকবার অনেক প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়েছি কিন্তু গণিত স্যারের ঘোষিত একক পুরস্কারের অংক দৌড় প্রতিযোগিতা আমার জীবনের সেরা প্রতিযোগিতা ছিল।স্যার ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে গণিত পড়িয়েছেন।এর পর তাঁর মেয়ের গণিতের পারঙ্গমতা আর তিনি শুনাননি কিন্তু স্যার যে সুন্দর গণিত বুঝাতেন তাতে তাঁর কন্যাকে ধিক্কার দিয়েছি। এমন স্যারের মেয়ের আজীবন গণিতে ১০০ তে ১০০ পাওয়া উচিৎ। স্যারকে খুব মিস করি।

প্রাথমিকে আরেকজন শিক্ষক ছিলেন আমজাদ স্যার, বাংলা পড়াতেন। আমার দেখা সবচেয়ে মেধাবী স্যার ছিলেন তিনি। পঞ্চম শ্রেণি বৃত্তির বৃহদাকার বইটি তিনি গুলিয়ে জাস্ট খাইয়ে দিয়েছিলেন।তিনি কখনো রাগ করতেন না কিন্তু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুধু শুনতে ইচ্ছে করতো।পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তিতে কত মার্কস পেয়েছিলাম জানিনা, তবে উপজেলার প্রথম হয়েছিলাম। স্যার আর নেই, স্যারের নিষ্পাপ মায়াবী মুখটা মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে, স্যার মজার মজার কবিতা শোনাতেন - বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে মাঝিরে কন, "বলতে পারিস সূর্যি কেন ওঠে ......?

রঘুনাথপুর মাদ্রাসার লাইব্রেরিয়ান হাবিবুর স্যার শুধু আমার ইংলিশ প্রাইভেটের স্যার ছিলেন তা নয়, ওই এলাকার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সকলের ইংরেজিতে পাশ করানোর দায়িত্বটা তাঁক কাঁধেই ছিল। স্যার খুব গর্বের সাথে বলতেন তিনি ইংলিশে ১০০ তে ৯০ পেয়েছিলেন ম্যাট্রিকে, কিন্তু গণিতে পাশ করতে পারেননি প্রথমবার। স্যার শুধু স্যার ছিলেন না, আমার বাল্যকালের প্রকৃত বন্ধুও ছিলেন।তিনিই শুধু বলেছিলে্ন “আমাদের ছাত্র অনেকে ভার্সিটির টিচার হয়েছে কিন্তু তোর মতো ভাল তারা ছিলনা। তবে তুই জীবনে তেমন কিছু করতে পারবিনা শুধু সিরিয়াসনেসের অভাবে।” আমি স্যারের কথা বিশ্বাস করতাম, কিন্তু মানতাম না। এখনও বিশ্বাস করি কিন্তু মানিনা।তবে এটুকু মানি যে স্যার আমাকে বুঝতেন।তাছাড়া মাধ্যমিকে উপজেলার ফার্স্টকে বলছেন জীবনে কিছু করতে পারবিনা। কিছুই করা হয়নি, স্যারের ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণ করতে আমি এখনো সচেষ্ট।স্যারের ফেসবুক রিকুয়েস্ট টা বেশ কিছুদিন ধরে না দেখার ভান করেছি এই ভয়ে যে,পাছে শুনতে হয় চরম সত্যবাণী “ জীবনে কিছুই করতে পারিসনি’’। 

মাঝে কোথায় পড়েছি কি পড়েছি কিছুই মনে পড়েনা।শুধু পাশ করে গেছি বিরতি দিয়ে, অবহেলায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আবার অতীতের সেই সোনালী ছাত্র জীবন ফিরে পেয়েছিলাম।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোন একজন মানুষ থাকে যার প্রভাবে মানুষ ব্যক্তি হয়ে ওঠে।বাংলা বিভাগে ভর্তি হবার পর থেকেই একটা অনিশ্চিত জীবনকে মেনেই নিয়েছিলাম, ঠিক তখন আমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন নতুন শিক্ষক পেলাম।সবাই আমাদের কোর্স পেতেন।আমরা যেমন নতুন যাত্রী তেমনি তারাও নবীন নাবিক। তাদের নব উদ্যোম আমাদের বেশ অনুপ্রাণিত করতো।তাদের মধ্যে একজন ছিলেন একটু ব্যতিক্রম। একটু বেশি রাগী, একটু বেশি ডিসিপ্লিন, একটু বেশি স্মার্ট। আমরা যারা একটু বেশি দুষ্ট তাদের ক্লাসের বাইরে কিংবা ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ইয়ারের অধিকাংশ সময়, যেটা স্কুল জীবনেও হয়নি।কেউ তাঁর পরীক্ষার খাতায় ভুল বানান কিংবা শ্রীহীন লেখা লিখলে তিনি মারাত্নক ক্ষেপে যেতেন। ভাগ্যিস হাতের লেখাটা পাঠযোগ্য ছিল।এইতো সেদিন ম্যামের কাছে জানতে চাইলাম- ম্যাম আমার লেখাটা কেমন হয়েছে? তিনি জবাব দিলেন, বেশ নানান ভুল। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম রাগী,অনুশাসনের বাইরে তিনি একজন অসাধারণ স্নিগ্ধ মনের মানুষ।আমরা সংস্কৃতির ‘স’ বুঝিনা, সবাই দস্যি ছেলের দল।সামনে বসন্ত বরণ উৎসব। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বসন্ত তাই একটু বেশি উচ্ছ্বসিত। তার উপরে উৎসবের দায়িত্ব বাংলা বিভাগের।তিনি ছিলেন অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির প্রধান। আমরা দস্যি ছেলের দল তাঁর কাছে আবদার করলাম একটা নাটিকা করব। তিনি প্রস্তাব শুনেই রিহার্সাল রুম থেকে বের করে দিলেন এবং অনুষ্ঠান সূচিতে নাটিকা রাখলেন না। আমরাও ছাড়বার পাত্র না। নিজেরা প্রাকটিস করে উপর মহলের অনুরোধে তাঁর অনেক শর্ত মেনে মঞ্চে তুললাম একটি নাটিকা। “কমলাকান্তের জবানবন্দী”। সেটা সেবার হিট হয়েছিল।পরদিন তিনি ডেকে শুধু প্রশংসাই করলেন না, শিষ্য বানালেন।পরে তিনি নাটকের খুঁটিনাটি নিয়ে আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। নাটক মঞ্চায়ণে মার্কস চালু করে নাটকের একটা বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রায় ডজন খানেক নাটক নির্দেশনা দিয়েছি এবং অভিনয় করেছি। শত ব্যস্ততায় নাটক ছাড়িনি শুধু তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে।তিনি ভ্রমণ সাহিত্য ও স্মৃতিকথা পড়াতেন।তাঁর বর্ণনায় ‘জীবনস্মৃতি’ পড়ে প্রথম রবীন্দ্রনাথ চিনেছিলাম। এতো সুন্দর করে তিনি কঙ্কাবতী পড়িয়েছিলেন, কবিতা কেন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারা তা সেদিন বুঝেছিলাম। তাঁর কাছে কেবল কবিতা পড়তাম তা নয় তার কবিতা আবৃত্তি আর পড়ানোর স্টাইল এতই মুগ্ধকর ছিল যে,কবিতার সাথে সাথে আমরা তাঁকেও পড়তাম মুগ্ধ হয়ে।কবির কঙ্কবতীকে হারানোর যে শঙ্কা ছিল আমাদেরও শঙ্কা ছিল ম্যাম মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন কি-না তা নিয়ে ।আমাদের শঙ্কা সত্যি হলো। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ার আগে সাবিনা ইয়াসমিন ম্যাম মাত্র তিন বছর ছিলেন আমাদের ভার্সিটিতে। সেটা ছিল আমাদের সোনালী সময়।তিনি ছিলেন সেই ধ্রুবতারা ...।যাকে আজও অনুসরণ করি। 

নিজেরো শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা হয়েছে বেশ কয়েকবার। ঢাকায় যখন কলেজে পড়তাম তখন এক নিকট আত্মীয়ের অনুশীলন নামে একটি কোচিং সেন্টার ছিল, ওখানে ক্লাস নিতাম।ছাত্ররা আমাকে খুব পছন্দ করতো। একদিন ওরা একটা ভোটের আয়োজন করে বসল কে হতে পারে স্যারের প্রিয় ছাত্র এ বিষয়ে। ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিল আমাদের কোচিং এর ছাত্র।সবাই তার নাম চিরকুটে লিখেছিল শুধু একজন ছাড়া। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সোমা কাগজে নিজের নাম লিখে দিয়েছিল।ওই এক ভোট পাওয়া সোমা’ই ছিল আমার প্রিয় স্টুডেন্ট।রাবিতে পড়ার সুযোগ হলো তাই ঢাকা ছেড়ে যেতে হবে ১০ আগস্ট।আগস্ট মাসের ২য় দিন ছোট্ট সোমা জানতে চায় ‘স্যার আজ কত তারিখ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম তারিখে কি হবে? ও জবাবে বলেছিল, স্যার ১০তারিখ যেন না আসে। সেদিন আমি কেঁদেছিলাম। 

শিক্ষা জীবন শেষ করে ঢাকায় এসেছি চাকরি খুঁজতে। টিউশনি করাই। ছাত্রী ক্লাস ফাইভে পড়ে। সবে একমাস পড়িয়েছি, সমাপনীর মডেল টেস্টে ফেল করে বসল সে।স্টুডেন্টকে জানালাম তোমাকে তো আর পড়ানো যাবেনা বাবা! সে খানিক ভেবে নিশ্চয়তা দিল সমাপনীতে ভাল করবে। সত্যি সত্যি সমাপনীতে ৯৫% মার্কস উপহার দিয়েছিল সে।ওই দিন বুঝেছিলাম সাজ্জাদ স্যারের চোখে কেন আনন্দ অশ্রু ছিল।
 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: bdnewshour24 শিক্ষক