banglanewspaper

র‍্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে একটা ভিন্ন জগৎ পাওয়া গেছে। গডফাদার নামে যে দুই-একজন নিয়ে মাতামাতি চলে এর বাইরে মূল ব্যবসায় অন্য লোকের সন্ধান পাওয়া গেছে।’ 

শনিবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) মিলনায়তনে ‘মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ শীর্ষক আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাসন অ্যান্ড টেকনোলজি ও আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এই ছায়াসংসদের আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। ছায়া সংসদে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাসন এন্ড টেকনোলজি সরকারি দল ও আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি দল হিসেবে অংশ নেয়।

র‍্যাব প্রধান বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। মাদকের একটা ভিন্ন জগৎ আবিষ্কার করলাম। গডফাদার নামে যে দুই-এক জন নিয়ে মিডিয়াতে মাতামাতি চলে, কিন্তু মূল বিজনেসে দেখি অন্য লোক। অনেক আননোন লোকজন এ ব্যবসা করছে। অভিনব সব কায়দায় তারা ইয়াবা পাচার করছে।’

এ অভিযার শুরুর পর মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র‍্যাব ১৭ হাজার জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেছি, তারপর ডিলারদের কাছে। এরপর ক্যারিয়ারের কাছে গেছি, এরপর যারা ইনভেস্ট করছে, যারা আমদানী করছে একন তাদের দিকে যাচ্ছি। তারা কাট অফ পদ্ধতিতে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তারপরেও আমরা ওই জায়গায় পৌঁছেছি।’

সামনে নির্বাচনের কারণে একটু অন্যদিকে নজর দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর মাদক বিরোধী এ অভিযানকে আরো গতিশীল করা হবে। সরকারের সদিচ্ছার সঙ্গে জনগণের সদিচ্ছার মেলবন্ধন করতে পারলে আমরা সব পারব। আমরা প্রত্যাশা করছি, এ যুদ্ধে সবার সমর্থন পাব, ব্যক্তিগত এবং সাংগঠনিকভাবে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় মিডিয়াতে গডফাদার হিসেবে ২-১ জনকে ইন্ডিকেট করে আসছে। তার পকেটে কি ইয়াবা আছে, তার বাড়িতে কি ইয়াবা আছে, সে কি ইয়াবার চালান নিয়ে আসে? তার আশে-পাশের লোকজন হয়তো এর সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ওই আশে-পাশের ২-১ জন কিন্তু নাই।’

কক্সবাজারে ২৩ লাখ মানুষের বসবাস উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ওখানকার ২৩ লাখ মানুষ কি ইয়াবার ব্যাবসা করে? নাকি এক লাখ মানুষ ব্যবসা করে? মাত্র গুটিকয়েক লোক এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাত্র কয়েকজন লোক বাংলাদেশে গুজব সৃষ্টি করেছে। তাদেরকে সামাজিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কক্সবাজারের ৪-৫শ' বা হাজারখানেক লোক যদি বাংলাদেশের সঙ্গে না থাকে তাহলে কি খুব সমস্যা হবে?’

তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে ফেনসিডিল আসতো, সে দেশে ফেনসিডিলের কারখানা। কিন্তু সেখানকার যুবসমাজ তো ফেনসিডিল খায় না। শুধুমাত্র মিয়ানমার থেকে এখন ইয়াবা আসছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু যেসব রোহিঙ্গারা এ দেশে ইয়াবা পাচার করে তাদেরকে তাড়ায়নি। মিয়ানমারের লোকতো ইয়াবা খায় না, আমরা কেন খাই? আমরা কেন ১ লাখ কোটি টাকা ধ্বংস করে দিচ্ছি?’

বেনজীর বলেন, ‘তরুণ সমাজের কাছে আমার প্রশ্ন, আমরা কেন ওদের ভিকটিম হবো? যারা ব্রিটিশ আমলে জন্মগ্রহন করেছে তাদের মনে ব্রিটিশ পাকিস্তান প্রীতি থাকতে পারে। যারা পাকিস্তান আমলে জন্ম নিয়েছে, তাদের কারো মনেও পাকিস্তান প্রীতি থাকতে পারে। কিন্তু তোমাদের জন্মতো বাংলাদেশে, তোমার দেশতো একটাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধীরা অপরাধ করে মানে তারা শক্তিশালী নয়। শক্তিশালী মেজরিটি, কিন্তু তারা সাইলেন্ট থাকে। মাদকের ১ লাখ কোটি টাকার ইকোনোমিতে শিক্ষক, পুলিশ থেকে শুরু করে এমন কোন পেশা নেই, যে সেই পেশার লোক জড়িত নেই। কিন্তু এ সমাজ থেকেইতো বিভিন্ন পেশাতে রিক্রুট করা হয়, তাদেরকেতো ফ্যাক্টরিতে তৈরি করা হয়না। তারা কেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেলো? সেজন্য প্রথমে আমাদের নিজেদের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।’

মাদকের জন্য প্রতি জেলায় আলাদা করে বিশেষ আদালত স্থাপনের প্রস্তাব জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যেসব মামলা হচ্ছে দেখা যাবে এই গতিতে চললে বিচার শেষ হতে ২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। অনেক বিচারক অবসরে রয়েছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে একটি আদালত তৈরি করা হোক। বিচারে আসামী খালাস পাক কিন্তু তবুও বিচারটা হোক।’

ছোট মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে এমন কথায় দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে কোন ছোট ব্যাবসায়ীকে ধরিনাই। একজনের সঙ্গে ১০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে, প্রতিপিসের ইয়াবার দাম যদি ৩০০ টাকা হয় তাহলে ৩০ লাখ টাকার ইয়াবা। এটা কোন ফকিন্নির কাছে থাকে না।’

‘তদবিরের জন্য গত ৫ মাসে কোন ফোন পাইনি, যেখানে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছি সেখানেই পেয়েছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি জনগণের সদিচ্ছা থাকলে এ যুদ্ধে অবশ্যই জয়ী হবো’-যোগ করেন তিনি।

ছায়া সংসদে সরকারি দল মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট বলে মত দেন এবং এ সংক্রান্ত একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন। তবে বিরোধীদল এর বিরোধীতা করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছাতেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।

দুই দলের যুক্তি উত্থাপন শেষে বিচারকরা সরকারী দল অর্থাৎ বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাসন এন্ড টেকনোলজিকে বিজয়ী ঘোষণা করে।

ট্যাগ: bdnewshour24 র‍্যাব র‍্যাব ডিজি