banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার: তখন আমি চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা। ২০১৫ সালের দিকে। যে বাসায় থেকে পড়াশুনা করতাম সে বাসাটিও একটি সাহিত্য ও সাংষ্কৃতিক সংগঠনের অধিনে ছিল। সকল সাহিত্য ও সাংষ্কৃতিক কর্মীরা সে বাসায় থাকত। খুব ভালোই ছিল দিনগুলো।

হঠাৎ একদিন শুনলাম সে সাংষ্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগেই তারা ভ্রমণের আয়োজন করেছে। আমি তাদের সংঘঠনের কেউ নই। তবুও যেন তারা আমাকে পর করে দিতে নারাজ। যেতেই হবে তাদের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত আমিও আর রাজি না হয়ে পারিনি।

সম্মতি জ্ঞাপন করতেই বাধ্য হলাম। তারা ভ্রমনের দিনের জন্য সবাইকে যেন এক মোড়কে মোড়িয়ে নিয়েছেন। সবার জন্য সাংষ্কৃতিক লগুযুক্ত সবুজ টি-শার্ট, টিসু, খাবার পানি, শুকনো খাবার, ভ্রমণের প্রয়োজনীয় পথ্য সহ আরো কত কি আয়োজন।

ভ্রমনের দিন খুব সকালে ফজরের নামাজের পর পরই চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট মোড়ে গাড়িসহ আমাদের ভ্রমনের সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত। নগরী থেকে বের হয়ে রাউজান উপজেলা হয়ে আমরা যাচ্ছি বান্দরবানের দিকে।

রাউজানের চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পার হবার পর রাস্তাঘাট আর নিজের আয়ত্তে রাখতে পারিনি। শুধু জানি যে আমরা বান্দরবান যাচ্ছি। দু’ঘন্টা পর আমাদের গাড়ি থেকে অবতরণ করার সময় হলো। আমরাও সবাই নেমে পড়লাম।

স্বর্ণমন্দির- জায়গাটির নাম নাকি স্বর্ণ মন্দির। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরটি নাকি বান্দরবন সদর থেকে ১০ কিমি দূরে অবস্থিত। এই পাহাড়ের একটি লেক আছে। লেকের নাম দেবতা পুকুর। দেবতা পুকুরটি সাড়ে ৩শত ফুট উচুতে হলে ও সব মৌসুমেই পানি থাকে। বৌদ্ধ ভানে-দের মতে, এটা দেবতার পুকুর তাই এখানে সব সময় পানি থাকে। আমরা উঠতেই থাকলাম পাহাড়ের চূড়ায়।

পথ যেন শেষই হয়না। পুরো শরীর ঘামে ছোপ ছোপ করছে। বহু সাধনার পর স্বর্ণ মন্দিরের দেখা পেলাম। এবার নাকি টিকেটও নিতে হবে। আমাদের সবার হয়ে একজনই সব টিকেট নিলেন। ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরো মন্দির প্রায় একঘণ্টা। আবার কিছু স্থানে যেতে ও দর্শন করতে আমাদের বারণও করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি বান্দরবানের পর্যটন কেন্দ্র গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হল বুদ্ধ ধাতু জাদি ক্যাং।

এই জাদিটি এখন বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের তীর্থ স্থান। এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত পেলেও এটি স্বর্ণ নির্মিত নয়। তবে দেখতে সোনার মতোই। বান্দরবানের যেকোন উচু ভবন বা উচু কোন পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে এ মন্দিরটি স্পষ্ট দেখা য়ায়। মূলত সোনালী রঙের জন্যেই এটির নাম হয়েছে স্বর্ণমন্দির। দেখতেও খুব অপরূপ। ভিতরে বৌদ্ধ ধর্মলম্বীদের নিমির্ত ছোট বড় বিভিন্ন মূর্তি। সব মূর্তিও সোনালী। আমরাও দেখে মুগ্ধ হলাম। মন্দিরের উপরে খাবারের দোকানও আছে, যদিও প্রত্যেক খাবারের দাম দ্বিগুন।

স্বর্ণমন্দির থেকে আমরা যাত্রা করলাম বান্দরবান সদরের উদ্দেশ্যে। সেখানে একটি রেস্তোরায় আমারা দুপুরের খাবার সেরে পাশে মসজিদ পেয়ে সুযোগে যোহরের নামাজ আদায় করে সেখানে একটু বিশ্রামও করে শক্তি সঞ্চয় করে নিলাম। 

মেঘলা- বিশ্রাম শেষে আবার যাত্রা শুরু। আমাদের গন্তব্য নাকি মেঘলা। আবার ছুটেই চলছি আমরা। মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে অপরূপ ফল, সবজি ও হরেক রকম ফসলের সমাহার, আর পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের ভিন্ন প্রজাতির জীবনযাত্র। দেখতে দেখতে আমরা পৌছে গেলাম মেঘলায়। সেখানেও এবার টিকেট নেয়ার পালা। আবারও আগের মতো আমরা টিকেট সংগ্রহ করলাম। ঢুকে পড়লাম মেঘলার অপরূপ সৌন্দর্য্যের গর্ভে।

সেখানে পাহাড়ের পদতলে অপরূপ লেক। আর লেকের উপর একাধিক ঝুলন্ত ব্রীজ। উপরে উঠে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। বিশাল আকৃতির লেকের পরে তিন’শ ফুট উঁচু পাহাড়। যে কারণে বাইরে চলাচলকারি যানবাহনের শব্দ আপনার শ্রবণ ইন্দ্রিয়র প্রশান্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। আরো আছে শিশুপার্ক, নামাজের জায়গাসহ দারুন সুবিধা।

দূষনমুক্ত এই লেকে চলার সময় দেখতে পাবেন নানান জাতের জলজ পাখির খেলা। মাথার উপর গাছের ডাল পানি ছুঁই ছুঁই করছে। সে সব গাছে কাঠ বিড়ালীর তিড়িং বিড়িং খেলা ও বিভিন্ন পাখির কলতান সব মিলিয়ে মনমুগ্ধকর পরিবেশ। নৌকায় চলার সময় মাথার উপর সাঁই সাঁই করে চলছে ক্যাবল কার।

যাতায়াত মিলিয়ে ১৬০০ ফুট দৈঘ্যের এ কেবল কার এক পাহাড় থেকে লেকের উপর দিয়ে অন্য পাহাড় ছুঁয়ে আসা ভ্রমণকারীদের মনে রোমাঞ্চকর অনূভূতির সঞ্চার করতে সক্ষম। পানির দু’শ ফুট উপরে দিয়ে ক্যাবল কারে যাতায়াতের সময় শূণ্যে ভেসে থাকার দারুন এক অনূভুতির সৃষ্টি হয়। ক্যাবল কার কারো কারো মনে কিঞ্চিত ভীতিও সঞ্চার করতে দেখেছি । আর পিকনিক স্পটের জন্যও অতুলনীয় এ মেঘলা। সেখানেও আমরা সময় কাটিয়েছি এক ঘণ্টার চেয়ে বেশি।

নীলাচল- মেঘলা থেকে বিদায় নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম নীলাচলের উদ্দেশ্যে। নীলাচল বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখানে নীলাচল পর্যটন কমপ্লেক্স বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তত্ববধায়নে বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়ার পাহাড় চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে আকর্ষণীয় এই পর্যটন কেন্দ্র। 

দেখে মনে হয়েছিল চির সুখের আভাস যে জান্নাত আছে তা বোঝি দেখতে এমনই হবে। ভারতের দার্জিলিংয়ে যারা ঘুরে এসেছেন তারা নীলাচলকে বাংলার দার্জিলিং বলে থাকেন। সেখানে রয়েছে শুভ্রনীলা,ঝুলন্ত নীলা, নীহারিকা এবং ভ্যালেন্টাইন পয়েন্ট নামে পর্যটকদের জন্য আকর্ষনীয় বিশ্রামাগার। কমপ্লেক্সের মাঝে বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা এবং বসার ব্যবস্থা রয়েছে।

পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো হয়েছে এ জায়গাগুলো। ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে সামনের পাহাড়ের দৃশ্যও ভিন্ন ভিন্ন রকম। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা, স্বতন্ত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬শ’ ফুট উঁচু এই জায়গায় বর্ষা, শরৎ আর হেমন্ত তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ। তবে  শীতকাল থাকার কারণে আমরা ছুঁতে পারিনি।

নীলাচল থেকে সমগ্র বান্দরবান শহর একনজরে দেখা যায়। স্পষ্ট দেখায়ায় স্বর্ণমন্দিরও। মেঘমুক্ত আকাশে কক্সবাজারর সমুদ্রসৈকতের অপুর্ব দৃশ্য নীলাচল থেকে পর্যটকেরা উপভোগ করতে পারেন। নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হল এখানকার নীল রং এর রিসোর্ট। নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট।

সাধারণ পর্যটকদের জন্য এ জায়গায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনুমতি আছে। আমরাও এর চেয়ে বেশি সময় থাকতে পারিনি। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সাবাইকে সংকেত দিয়ে বের করে দেয়া হলো। নীলাচলের সে সন্ধ্যা এমন ভাবে আকৃষ্ট করছিল যে, ইচ্ছে হয়েছে নীলাচলে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু সেখানকার নীতিমালা আমাদের আবেগের কোন মূল্য প্রদান করেনি। বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হল।

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

ট্যাগ: bdnewshour24 নীলাচল