banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার: উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের নদীর তীর এলাকার বাসিন্দা ইমদাদ ও নওশীন ৫ ছেলে এক মেয়ে নিয়ে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। তারপরও জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল এ দম্পতিকে।

তাদের যোগানের চেয়ে নিষ্ঠুর জীবনাচরণের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছিল। যুদ্ধ ক্ষেত্রে বার বার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছেন জীবনের কাছে। বিদেশে নারী শ্রমিদের করুণ পরিণতির ইতিহাস জেনেও এক পর্যায়ে শ্রম বিক্রির মোহে দুবাই গিয়েছিলেন নওশীন।

সেখানে গিয়েও সংসারের যোগান পরিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি করেনি সে।

ইমদাদের স্ত্রী নওশীন বেগম দুবাই থেকে এক বছর আগে দেশে ফিরেন। এরপরও তাদের সংসারের চাহিদা পূরণ করতে না পেরে পুনরায় গ্রামের অদূরে এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন।

মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো। পেটের আহারের যোগান না থাকলে ভালবাসার পুঁজি দিয়ে কতদিন আর চলে। সহ্য ক্ষমতারও তো শেষ আছে। ধৈর্য শক্তিও একসময় ফুরিয়ে যায়। অন্যান্য রাতের মত তেমন একটি বসন্তের রাত ছিল সেদিন। মৃদু উঞ্চতার মাঝে হালকা শীতল পরশ। জোৎন্সার আচঁলে ঢাকা পৃথিবী। আকাশের তারাগুলো মাতামাতি করছে। ইমদাদ আর নওশীনের মধ্যে বাধল তুমুল ঝগড়া।

ঝগড়ার ধারাবাহিকতাও প্রতিদিনের স্বাভাবিক নীতির বিপরীত নয়। কেউ ঝগড়া থামাতেও এগিয়ে আসছে না। কারণ তাদের সন্তান ও প্রতিবেশীরাও তাদের ঝগড়ার মধ্যে আর বিশেষ কিছু পায় না। সে প্রতিদিনের একই ইস্যু। তাই ইমদাদ-নওশীনের ঝগড়াও আজকাল তারা থামাতে আসেনা। তারাও নিত্যদিনের দৃশ্য অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই তাদের কাছেও ঝগড়া এখন আর অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়না। তারা দু’জন ঝসড়ার মধ্যে থাকতেই ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল আশপাশের সবাই।

সকালে দম্পতির মেয়ে আলেয়া তার মা-বাবার ঘরের দরজা খুলতে না পেরে বেড়ার ছিদ্র দিয়ে মায়ের গলাকাটা মরদেহ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। ঘরে প্রবেশ করে দেখেন ঘরের চালের সঙ্গে ঝুলছে বাবার লাশ। পরে পুলিশকে খবর দিলে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।

এভাবেই রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতাবাদীদের দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায় নিভৃত পল্লীর হত দরিদ্র বহু কৃষক-কৃষাণীর তাজা প্রাণ। কারণে অশারণে স্তব্দ হয়ে যায় ধুলো এবং কাদার সঙ্গে আলিঙ্গণ করা কর্মচঞ্চল জীবন গুলো। যাদের দেহের ঘামকে পুঁজি করে সজিব থাকে সমাজ, রাষ্ট্র ও আপামর মানবতা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তাদেরকে শুধুমাত্র কৃষকদের জন্য বিশাল বিশাল উক্তি উচ্চারণ করতে দেখা যায়।

তাদের দুঃখ-বেদনার গ্লানি ও ধুলোবালি-কাদায় মাখা জীবনযাত্রা শুধুমাত্র জাদুঘরের প্রদর্শনী আর ব্যানার-ফেস্টেুনে স্থান পায়, তৈরি হয় মোটা অংকের টাকা খরচ করে দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম, কোটি টাকা খরচ করে করুণ কাহিনী সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র। তাদের নিয়ে রচিত আবেগপূর্ণ গানের মধ্যে করুণ সুর দিয়ে শুধুমাত্র শ্রুতিমধুর করা হয়। যা শুরু ক্ষণিকে আবেগের খোরাক দেওয়ার কাজেই ব্যবহার হয়ে থাকে।

কেউ সামান্য আহত হলে সুশীল সমাজ ও মন্ত্রীদের হাসপাতালে কোলাহল পড়ে যায়। আবার কারো জীবন বিন্যাস হলেও রাষ্ট্র ও সমাজের কর্র্ণধারদের শ্রুতিযন্ত্র স্পর্শ করে না। কারো জ্বর-পেটের ব্যথা গণমাধ্যমকে এমন নিবিড় করে আপন করে নেয় তা গণমাধ্যম তাকে ছাড়তেই পারে না। আবার কারো জীবন পতনের খবরও গণমাধ্যম পর্যন্ত আসার সৌভাগ্য লাভ করে না। যে জীবন গুলো সহস্র জীবন টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নিয়োজিত সেগুলোই ঝরে যায় নীরবে। বিদায়ের বেলাও ভাল কাটেনা তাদের।

কোন অভিজাত হাসপাতাল কিংবা কোন বিলাসবহুল যান দুর্ঘটনায় নয়। প্রতিদিন খালের পাড়ে, ডোবার ধারে, ফসলের মাঠে অথবা পরিত্যাক্ত কোন অন্ধকার স্থানে তাদের লাশের সন্ধান মেলে। কতগুলো জীবনের খবর রাখি আমরা। মূলত পরোক্ষভাবে শুধুমাত্র নিজের জীবনের খবরই রাখি আমরা প্রত্যেকে।

(বি:দ্র: এ গল্পের চরিত্র ও স্থানের নাম রূপক, তবে গল্পটি বাস্তব জীবন হতে নেওয়া)

ট্যাগ: bdnewshour24 কয়টি জীবন