banglanewspaper

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে নৌকার প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন ৪ হাজার ২৩ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম ও বিএম মোজাম্মেল হক। মনোনয়নের খসড়া তালিকায় তাদের দুজনকে ‘স্থগিত’ ও অন্য দুইজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন চারদিকে।

সোমবার (১৯ নভেম্বর) বিকেলে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তাদের চারজনের অনুপস্থিতি এ গুঞ্জনকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট এসব প্রার্থীকে নিয়ে ছড়ানো গুঞ্জনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বিভিন্ন মহলে।

সূত্র জানিয়েছে, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩২ সংসদীয় আসনে প্রার্থী তালিকার খসড়া করেছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড। এই তালিকায় নাম নেই দুই কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের আসনে মনোনয়ন ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে। তারা দুজনেরই ১০ম জাতীয় সংসদে যথাক্রমে ফরিদপুর-১ ও ঢাকা-১৩ থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনকে খুব কঠিন হচ্ছে ধরে নিয়ে প্রার্থী নির্বাচনে বেশ সতর্ক আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে জিতে আসার মত ক্লিন ইমেজের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। গতবারের মত মুখ দেখে প্রার্থী এবার ঠিক করা হবে না। মনোনয়নের ক্ষেত্রে মাঠ জরিপ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরা মনোনয়ন পাবেন।

হেভিওয়েট প্রার্থীদের বাদ পড়ার পেছনে কারণ হিসেবে যেসব বিষয় এসেছে সেগুলো হচ্ছে জনপ্রিয়তা হারানো ও দলীয় কোন্দল। আবার জোট-মহাজোটের সমীকরণে পড়ে কারও কারও কপাল পুড়ছে বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-১৩ আসনে জাহাঙ্গীর কবির নানক জনপ্রিয় হলেও তার ব্যাপারে আপত্তি আছে একটি প্রভাবশালী বিদেশী রাষ্ট্রের। কিছুদিন আগে রাতে রাজধানীর মোহম্মাদপুরে এক বিদেশী রাষ্ট্রের কূটনীতিকের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা হয়েছিল। এরপর থেকেই ওই এলাকার সাংসদ নানকের ব্যাপারে তাদের আপত্তি হয়। এছাড়া তার বিপক্ষে গ্রুপ্রিংয়েরও বিস্তর অভিযোগ আছে। এমনকি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পত্র বিক্রিকালীন সময়ে মোহাম্মদপুরে দুই ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনাতেও বিব্রত হয় আওয়ামী লীগ। ওই ঘটনায় নানকের ভূমিকাতেও ‘নাখোশ’ দলীয় হাইকমাণ্ড। তাই ঢাকা-১৩ আসনে মহাজোটের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে সময় নিতে চায় মনোনয়ন বোর্ড।

ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলা, আলফাডাঙা উপজেলা ও বোয়ালমারী উপজেলা নিয়ে ফরিদপুর-১ আসন গঠিত। এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। তবে এ আসন থেকে এবার আওয়ামী লীগের রেকর্ড সংখ্যক ২২ মনোনয়ন প্রত্যাশী মনোনয়নপত্র কিনে জমা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি সাবেক এমপি কাজী সিরাজুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, তিতাস গ্যাস লিমিটেডের পরিচালক ও ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খান মঈনুল ইসলাম মোস্তাক উল্লেখযোগ্য।

স্থানীয় সংগঠনকে দুর্বল করার অভিযোগ বর্তমান এমপি আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে। চার মনোনয়নপ্রত্যাশী একজোট হয়ে ইতোমধ্যে হাইকমাণ্ডের কাছে তার বিরুদ্ধে সে অভিযোগও করেছেন। তাই এই আসনের মনোনয়ন নিয়েও আরো আলোচনা করতে চান সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড সদস্যরা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আবদুর রহমান না হলে মনোনয়ন প্রাপ্তির দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে থাকবেন সাবেক এমপি কাজী সিরাজুল ইসলাম। কারণ ভোটারদের মধ্যে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। দু'বারের এমপি থাকাকালে তিনি ব্যাপক উন্নয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কাজী সিরাজুল ইসলাম ছাড়াও আলোচনায় আছেন আরিফুর রহমান দোলন।

মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগে রাজনীতিতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। তাদের কারণে জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি দারুণভাবে বিভক্ত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও বিভক্তির রাজনীতি চর্চা করছে। দুই নেতার অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কার্যক্রম পৃথকভাবে পালন করছে। তাদের দুজনের সংসদীয় আসনও এক। তাই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌমন্ত্রী শাজাহন খান মাদারীপুর-২ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করলে বাহাউদ্দিন নাছিমকে মাদারীপুর-৩ থেকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে এবার মাদারীপুর-৩ থেকে সাবেক যোগযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপও শক্ত প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। বাহাউদ্দিন যাতে মনোনয়ন না পান, সে বিষয়ে শাজাহান খান ও সৈয়দ আবুল হোসেন দুজনই তৎপর বলে দলীয় সূত্র জানায়।

অন্যদিকে আবদুস সোবহান গোলাপের প্রতি দলীয় সভাপতির ‘নেক নজর’ তাকে মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে দেয়।

শরীয়তপুর-১ আসনে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হকও দুবারের সাংসদ। এই আসনে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইকবাল হোসেন অপু। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় দলাদলিতে মোজাম্মেল অনেকটাই কোণঠাসা। শুধু তাই নয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার বিরুদ্ধে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ‘টাকার বিনিময়ে’ বিএনপি জামায়াতের লোকদেরকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া, সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। যার খেসারত হয়ত তাকে এবার দিতে হচ্ছে।

জানা গেছে, মনোনয়ন স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ায় জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান দুজনেই গণভবনে ছুটে যান। সেখানে তারা আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে দেখা করে আত্নপক্ষ সমর্থন করে কথা বলেন। অন্যদিকে ড. আবদুস সেবাহান গোলাপ ও ইকবাল হোসেন অপুর মনোনয়ন নিশ্চিত করার তথ্য জেলা ও উপজেলা অওয়ামী লীগের নেতাদেরও গণভবন থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, ‘খসড়া তালিকা করা হয়েছে। আজ (সোমবার) ও আগামীকাল বসা হবে। চূড়ান্ত হওয়ার পর আমাদের মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিক্রমে মনোনীত প্রার্থীদের চিঠি দেয়া হবে।’

সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যসচিব ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন,‘আওয়ামী লীগ কারও মনোনয়নই চূড়ান্ত করেনি। দলের মনোনয়ন নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তালিকা মনগড়া, এগুলোর বাস্তবসম্মত ভিত্তি নেই।’

ট্যাগ: bdnewshour24 মনোনয়নপত্র আওয়ামী লীগ