banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার:
অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন থেকে শুরু করে সকল কাজেই রয়েছে শুভচিন্তার অফুরন্ত সমাহার। কিন্তু একে ঘিরে আমাদের সকল উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও কিছু বিষয় অত্যন্ত নেতিবাচক ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য হুমকি। 

প্রথমত পুস্তক প্রকাশকদের কথাই বলা যাক। তারা গ্রন্থমেলার মৌলিক ধারণার প্রতি আস্থা অর্জনে কোন কাজ করেন না বললেই চলে। অধিকাংশ প্রকাশক শুধু এ মেলাকে নিজেদের মুনাফা অর্জনের একটি মাধ্যম বলেই মনে করেন। সঙ্গে সঙ্গে বঞ্চিত করেন লেখকদেরও। যার প্রমাণ হিসেবে প্রকাশকদের সর্বদা প্রকাশনা খাতকে অলাভজনক খাত হিসেবেই উপস্থাপন করতে দেখা যায়। কিন্তু সে খাতে তারা টিকে থাকেন যুগের পর যুগ। আর প্রত্যেকটি বই পাঠকের কাছে পৌছে দেয়া এবং সে বইয়ের প্রয়োজনীয়তা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে বই লেখা, উৎপাদন ও বিপননকে সফল করতে সকল পদক্ষেপ থাকে প্রকাশকদের হাতে। তারা ইচ্ছে করলে কোন নিম্ন মানের বইকে পাঠকপ্রিয়তা দিতে পারেন। আবার ইচ্ছে করলে কোন মানসম্পন্ন বইকেও পারেন মানহীনতার কাতারে ফেলতে। আর তাদের সে সক্ষমতাকে পুঁজি করে নতুন লেখকদের নিকট থেকে লুপে নেন নিজের মুনাফাসহ বই উৎপাদনের সম্পূর্ণ খরচ। আর টাকার বান্ডেল নিয়ে ঘুরে বেড়ান প্রসিদ্ধ লেখকদের ধারে ধারে। এরপর বই বিক্রি না হলেও প্রকাশকদের কোন ক্ষতি নেই। যা বিক্রি হয় তা পরে প্রকাশকের অতিরিক্ত বোনাসের তালিকায় যুক্ত হয়। লেখক থাকে পূর্বের ন্যায় সে শূণ্য হাতে খাতা আর কলম নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কয়েকটি ফটোসেশন আর অটোগ্রাফ দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় লেখককে। এতে বোঝা যায় লেখকের লেখা আর বইয়ের মূল্যায়ন করার কোন সঠিক মানদন্ড আমাদের নিকট নেই। লেখা আর বই মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অনিয়ম স্বজনপ্রীতি ও অন্ধত্বের আশ্রয় নেয়া হয়। 

এবার লেখকদের কথাই বলা যাক। অধিকাংশ লেখক রসাত্মক চমক, দৃষ্টিদন্দন প্রচ্ছদ ও মৌলিকতা বিবর্জিত বই প্রকাশ করে সাময়িক ভাবে পাঠকদের মনোরঞ্জন করতে ব্যস্ত থাকেন। সারা বছরই লেখে বেড়ান ভূত, এলিয়েন আর মিথ্যা ও কাল্পনিক দৈত্য দানবের গল্প। যার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্তই রয়েছে মিথ্যার ছড়াছড়ি। গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখা যায় যা একদমই হাস্যকর। ছোটদের বইয়ের ক্ষেত্রেই এমনটি বেশি ঘটে। আর এতে চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে ছোটদের মঝে। অদূর ভবিষ্যতের বাস্তব জীবনের দিকনির্দেশনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে তাদের মাঝে জন্ম নেয় চরম অনিহা। এরপর বইমেলায় এসেই তারা খুঁজতে থাকে দৈত্য-দানব আর ভূত-পেতিœর গল্পের বই। আর অভিবাবকরাও এসব লেখকদের আদর্শ হিসেবে গণ্য করেন। অথচ এ লেখকরাই শিশুদের আদর্শ একটি জীবন বিনির্মাণের ক্ষেত্রে বিষপোঁড়া ও হুমকি। যার কারণে বাস্তবতার প্রতি শিশুরা থাকে একদম বেখেয়াল। তাই বাস্তব জীবনের সূচনায় তাদের জীবন বিনির্মানের ক্ষেত্রে পড়তে হয় বিপাকে। 

জাতীয় গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর মতো কর্তা প্রতিষ্ঠান গুলোর নিকটও এসব মিথ্যা ভূত পেতিœ সর্বস্ব লেখকদের মূল্যায়ন অনেক। প্রত্যেক বছরই স্বর্ণপদক আর মোটা অঙ্কের পুরষ্কার গুলো ঝুলিয়ে দেয়া হয় তাদের গলায়। কিন্তু তারা সে বিষয়বস্তুকে নিয়ে শিশুদের আনন্দ দেন তা সম্পূর্ণ নিছক ও প্রতারণা পরবশ। এ ধরণের বিষয়গুলো সবসময় আমাদের দৃষ্টির অগোচরেই পড়ে থাকে। 

যে মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমরা আজ বিশ্বব্যাপি সমাদিত আর ভাষার মাসকে ঘিরে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য যে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয় সে মেলার বিভিন্ন সেমিনারে কথায় কথায় বাংলা-ইংরেজীর মিশ্রণ না করলে যেন বিশিষ্টজনদের খাবারই হজম হয় না। এভাবে বলতে পেরে তারা নিজের বড়ো প-িত হিসেবে পরিচয় দেন এবং গর্ববোধ করেন অসামাণ্য পরিমাণে। আর এতে নতুন প্রজন্ম নিজস্ব সংষ্কৃতির প্রতি অনুপ্রাণিত হবার বিপরীতে তা হতে বিমুখই হয় বেশি। 

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: bdnewshour24 গ্রন্থমেলা