banglanewspaper

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

সুদীর্ঘ ২৯ বছর অপেক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে কিংবা ভোটার হিসাবে অংশ গ্রহণের সুযোগ পেলো। এর আগে দু’বার পর পর নির্বাচন হয়েছিল একটি ১৯৮৯-৯০ সালে, অপরটি ১৯৯০-৯১ সালে।

১৯৮৯-৯০ নির্বাচনের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছিলাম। নির্বাচনটি স্বচ্ছতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, পরের বছরের নির্বাচনেও কারচুপি নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠেনি। এবারের নির্বাচনটিও এমনি হবে বলে মনে করেছিলাম।

কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট, কলাম লেখক বা ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের অভিমত থেকে এ’কথা বলা যায় যে নির্বাচনটি স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিকে অনুষ্ঠিত হয়নি। অস্বচ্ছতার সূচনা হয় কুয়েত মৈত্রী হল থেকে। সেখানকার প্রভোস্ট শবনম জাহান আমার ছাত্রী, তাই ব্যথাটা আমার কাছে সেলের মত বিধঁছে।

আসলে সে হলে কি হয়েছিল? সত্যিই কি এই নিরীহ-নির্বিবাদী শিক্ষকটি এমন কোন অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়েছিল না তার এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে ক্ষত বিক্ষত করার জন্যে তৃতীয় পক্ষ এমন কাজটি করেছে? ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক ও ডাকসুতে নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এমন একটি কথা গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন।

আমার ধারনা বিষয়টি সহজে ছেড়ে দেবার নয়। যদি গোলাম রাব্বানীর অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে আমার প্রিয় সংগঠন ছাত্রলীগ বহুবিধ ভিত্তিহীন ও কাঙ্খিত অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে, আর প্রশাসন তার বিদীর্ণ ভাবমূর্তি আবার বিনির্মানের সুযোগ পাবে। একই সাথে শবনমও তার বিকৃত ভাবমূর্তি পূর্ণস্থাপনের সুযোগ পাবে। শবনমের জন্যে এটা অতি আবশ্যক। কারণ এই মাসের মধ্যে সে অধ্যাপক পদের জন্যে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে যাচ্ছে।

নির্বাচনে অনেক কিছুর সাথে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হেস্তন্যস্তের ঘটনা আমাকে বিক্ষুব্ধ করেছে। আমি যখন প্রক্টর ছিলাম রোকেয়া হলে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচুর অস্ত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। আমার দেহের প্রতিটি স্থানে অস্ত্র ঠেকিয়ে লাশ ফেলে দেবার স্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কেউ গুলি ছুড়েনি কিংবা আমার গায়ে হাত দেয়নি।

তাহলে বুঝা যাচ্ছে এই প্রশ্নেও একটা গুনগত পরিবর্তন সমধিত হয়েছে। এবারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান বাম ছাত্র দল বা জোটের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তাকে রোকেয়া হল থেকে তাড়িয়ে অপরাজেয় বাংলা পর্যন্ত ঠেলে দেবার কথা শুনে আমি শংকিত ও আতঙ্কিত হয়েছি। কেউ কেউ এতে তৃপ্তির হাসি হেঁসেছেন। আমি একটি গ্রাম্য প্রবাদ শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- ‘পাঁঠারে বলি দেয়, পাঁটি হাসে, পাঁঠা বলে, তোর জন্যে মুসলমানের বকরী ঈদ আছে।’

আবার বলছি ঘটনা ঘটেছে বামপন্থী ছাত্রদের দ্বারা। আগে এ কাজটা যারা করত তারা কমবেশ দক্ষিণ পন্থী বলেই চিহ্নিত হয়েছিল, ধর্মান্ধও বলা যায়। তারপর এমন একটা লোককে লাঞ্ছিত করা হলো যার নির্বাচন স্থগিত করা বা ফল ঘোষণা এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা ছিল না। বাইরের লোকেরা হয়ত ভাবতে পারে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই সব ক্ষমতার অধিকারী।

ডাকসু নির্বাচনে সবচে ক্ষমতাবান ব্যক্তিটি হচ্ছেন প্রক্টর। প্রক্টরকে বলা হয় ক্যাম্পাসের আইজি। তাকে টার্গেট করা যেমন অসঙ্গতি তেমনি অসঙ্গত যে কোন শিক্ষার্থীর অশোভন আচরণ। তারা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেনি? এসব কিছু তদন্ত হবে, তদন্তে অনেক সত্যি বের হয়ে আসবে এবং আশা করছি বিচারও হবে। আমরা অপেক্ষায় থাকব। অপেক্ষায় থাকব প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লাঞ্ছনাকারী তথাকথিত শিক্ষার্থীদের স্বরূপ উদঘাটনের।

আর একটি জিজ্ঞাসা-শিক্ষকদের নৈতিকতার মান সত্যি কি নিচে নেমে গেছে?

২৯ বছর পর ডাকসু নির্বাচনে অব্যবস্থার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শেষ হয়ে গেছে বলে যে শোরগোল হচ্ছে তা বোধ হয় সঠিক নেই। অন্তত: ছাত্রলীগ সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের নির্বাচনোত্তর বক্তব্য থেকে আমি আশার আলো দেখছি। 

লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: bdnewshour24 ডাকসু নির্বাচন দুর্ভাবনা ভাবনা অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী