banglanewspaper

বাংলাদেশ প্রবাদতুল্য তিনটি উক্তি আছে যা হলো বাংলাদেশের ইতিহাস মানে ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস মানে আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। উক্তি তিনটি কমবেশি গ্রহনযোগ্য, কিন্তু এই প্রবন্ধে আমি শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের ১লা জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাকে প্রায়শঃ ‘রাজকীয় ক্ষতিপূরণ’ বলে ধারনা করা হয়। ১৯০৫ সালে বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠিত হয় এবং ১৯১১ সালে তথাকথিত হিন্দু ভদ্রলোকদের আন্দোলনের প্রেক্ষীতে এই বঙ্গভঙ্গ রোধ করা হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের বিক্ষুব্ধতাকে প্রশমনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসাবে পরিত্যক্ত কতিপয় সুরম্য প্রাসাদ ও রমনার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ও উপাচার্য ভবন এর ন্যায় দু’একটি বাংলো আজও সে স্মৃতি বহন করে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে মুসলিম জাগরনে একটি মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করা যায়। এই সময় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তীব্র হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন কিছু গ্রাজুয়েট জন্ম নেয় যারা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং মুসলমানদের একক প্রতিষ্ঠান মুসলীম লীগের জন্ম ও বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান আন্দোলনের এক প্রধান নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই তার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু রাজনৈতিক নেতা ও যুব নেতারা ঢাকায় বসবাস গড়েন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বরন করেন। কেউ কেউ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করলেও ঢাকায় এসে তার সমাপ্তি টানার প্রয়াস নেন। বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এ’সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন’, যদিও ঘটনা পরম্পরায় তিনি ডিগ্রি শেষ করতে পারেন নি। অধ্যায়নকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বহিস্কৃত হন। 

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানে কিংবা পাকিস্তানপূর্ব বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের সূচনা কারীদের বেশ অনেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আবারও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আসতে হয়। তার সংগঠন ছাত্রলীগ ও তাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বস্তুতঃ ভাষা আন্দোলনকে বাংগালীর সুপ্তি ভঙ্গের আন্দোলন বা বাঙালী জাতি সত্বার রেনেসা বা পুনর্জাগরন বলে অভিহিত করা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের মহানায়কদের সাথে যেমন শেখ মুজিবের নাম জড়িয়ে আছে তেমনি আছে আবুল কাশেম, নুরুল হক ভূঁইয়া, অলি আহাদ, কামরুদ্দিন আহমদ, আতাউর রহমান খান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর নাম। তারা ছিলেন এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আত্মাহুতিদাতাদের কেউ কেউ ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

ভাষা আন্দোলনের পর যে আলেখ্য বিশিষ্টতা অর্জন করে আছে তার নাম হলো যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের পূর্বাংশের প্রাদেশিক নির্বাচনে তার বিজয়। এই যুক্তফ্রন্টের তিন নেতার একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই যুক্তফ্রন্ট ভিত্তিক স্বাধীকার আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্পৃক্ত ছিল। সম্পৃক্ত ছিল কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল শামসুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। 

১৯৫৪ সালে যে ছাত্রটি নূরুল আমিনকে নির্বাচনী ভোটে পরাজিত করেছিলেন সেই খালেক নেওয়াজও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই সময়ে স্বায়ত্ব শাসন চেতনা তীব্রতর হতে থাকে, যখন যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ভানুমতির খেলা শুরু হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ৬ দফা আন্দোলনের কথা অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনের মহান প্রণেতা ও প্রবক্তা ছিলেন শেখ মুজিব। তার সুযোগ্য সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। ইতোপূর্বে দুই অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি রচয়িতারা বিশেষতঃ আতোয়ার হোসেন, আনিসুর রহমান, নূরুল ইসলাম, ওয়াহিদুল হক ও রেহমান সোবহান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। 

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিকদের প্রায় সবাই ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে আয়ুব বিরোধী ও মার্শাল ল বিরোধী এসব আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল। ছাত্র শক্তি নামে একটি ছাত্র সংগঠন তাদের সহযোগী হিসাবে কাজ করে। এ’সব সংগঠনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া তারা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের শিক্ষার্থী। ১৯৬২ সালের দিকে শেখ মুজিব আগরতলা গিয়েছিলেন এবং সে সময় থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতীয় সম্মতি লাভ করেন। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি কতিপয় গোপন সংগঠন যথা স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদ; বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ) গঠনে ব্রতী হন। ১৯৫৯ সালে সংগোপনে ছাত্রলীগকে পূর্ণজীবিত করার পরই বঙ্গবন্ধু উপর্যুক্ত দু’টি সংগঠনের জন্ম দেন। এ’সবের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ।  

১৯৬৪ সালের আইয়ুব ও মোনেম বিরোধী আন্দোলনের সৈনিকগণ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময়কার আছমত আলী শিকদার, শেখ ফজলুল হক মনি, কমরেড ফরহাদ, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরীর নাম কে না জানে। তবে তারা যে সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন সে কথা হয়ত অনেকে জানেন না। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে অপর একটি অনন্য ঘটনা হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুনের হরতাল। ৬ দফার স্বপক্ষে ও শেখ মুজিবের মুক্তির লক্ষ্যে সেদিন সারা বাংলাদেশকে স্তব্দ করে দেয়া হয়েছিল। সেদিনের নেতৃত্বে শিরোভাগে ছিলেন শেখ ফজলুল হক, সিরাজুল আলম খান, আল-আমিন চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল মান্নান চৌধুরী, মনিরুল হক চৌধুরী, শেখ শহিদুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ। এদের সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলনের সব নেতারাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। তোফায়েল আহমদ এর ন্যায় কিংবদন্তী নেতা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, শামসুদ্দোহা, মাহবুবুল হক দোলন, ফখরুল ইসলাম, নাজিম কামরান চৌধুরী বা দীপা দত্ত ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী। 

১৯৬৮-৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের পুরোধা ব্যক্তিদের সব ক’জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে তারাই বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভূষিত করেছিলেন। ৬ দফা ও ১১ দফার নেপথ্যের মন্ত্রনাদাতা যথা- আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি ও মতিয়া চৌধুরী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি সন্তান। ৬ দফা আন্দোলনের পূর্বে অতি সংগোপনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগকে পুর্নজীবিত করা হয়। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে কয়েকটি বাহিনী যথা জহুর বাহিনী, জয় বাংলা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এগুলো ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক। ৬ দফা আন্দোলনে সহায়ক শক্তি হিসেবে শিল্প ও সাহিত্য সংঘ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠাকালে এর প্রধান ছিলেন রফিকুল্লাহ চৌধুরী। অমর একুশের সংগীত রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, খালেদ হাশিম, আবদুল মান্নান চৌধুরীও এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আয়ূব মোনায়েমের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত ছাত্রলীগের সম্পূরক হিসাবে এর অবদান অনস্বীকার্য। সংস্কৃতি সংসদও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছিল এবং তার নেতারা রাজনীতির সম্পূরক সংস্কৃতি চেতনায় অগ্রগামী ছিলেন।  

আয়ুব-মোনায়েমের পতনের পর ইয়াহিয়ার মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কৃতিত্ব রয়েছে। পাকিস্তানে এক ব্যক্তি এক ভোট ব্যবস্থায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন এবং এবারে আর স্বায়ত্ব শাসন নয়, সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যান। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখক ছাত্রনেতা নির্বাচনে অংশ নেন। তাদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সত্তর সালের নির্বাচনের পরই বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন যে সেই ১৯৫৪ সালের মতই তাকে ও তার দলকে ক্ষমতায় যেতে দেয়া হবেনা। তাই তিনি স্বশস্ত্র যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্মতি নিয়ে রাখেন। ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ প্রদানসহ বিভিন্ন ধরনের সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের মাধ্যমে আত্ম-অবমাননাকর বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রস্তাবও দেয়া হয়। এ’সব প্রস্তাবে সাড়া না দিতে গৃহাভ্যন্তর থেকে শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ হাসিনা, ড. আবদুল ওয়াজেদ মিয়া ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর মনোবল তুঙ্গে উঠে। তবে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েও সন্দেহ পোষন করেন। তাই ১৯৭১ সালের প্রথম পর্বে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ৬ দফার স্বপক্ষে অনড় থাকার শপথ বাক্য পাঠ করান। তারপর কি হতে যাচ্ছে তা তিনি জানতেন। তিনি ১লা মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিতের অগ্রিম খবরও জানতেন। ১লা মার্চের জঙ্গী কার্যক্রম ২৮ ফেব্রুয়ারীতে নির্ধারিত হন। মূলত: সেদিন থেকেই চার যুব নেতা তথা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও চার ছাত্রনেতা তথা আ, স, ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজের উপর তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের দায়িত্ব অর্পন করেন। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে বাংলাদেশের পতাকা জনসম্মুখে প্রদর্শিত হয়। ৩রা মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার প্রস্তাব, জাতীয় সংগীত ও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পালিত হয়। তবে ৩রা মার্চ সকাল এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ স্বাধীনতার স্বপক্ষে সক্রিয় ভূমিকায় নামেন। ঐদিন বেলা এগারোটায় শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১ দফা অর্থাৎ স্বাধীনতার স্বপক্ষে বটতলায় এক সভা অনুষ্ঠিত হন। বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক আবদুল মান্নান চৌধুরীর প্রস্তাবনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের আগেই ৬ দফার বদলে এক দফার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত সভা ও বৈকালিক টেলিফোন যোগাযোগের পর বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত হন যে সশস্ত্র লড়াই ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি এই সিদ্ধান্ত শেখ মনি ও আবদুল মান্নান চৌধুরীকে জানিয়ে দেবার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাধীকার ও স্বায়ত্ব শাসনের গন্ডি ছাড়িয়ে স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। 

১লা মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা অস্ত্র লুট ও অস্ত্রের প্রশিক্ষণে ব্রতী হন। শিক্ষকরা এক ধরনের থিংক ট্যাংক গড়ে তুলেন এবং বঙ্গবন্ধু ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে লিয়াজোঁ করার জন্যে আবদুল মান্নান চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। 

৩রা মার্চের পর ছাত্র নেতৃত্বের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক ৭ মার্চের ভাষণ তৈরীতে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সে ভাষন সম্পূর্ণ ছিল বঙ্গবন্ধুর একক ও নিজস্ব। সে ভাষনের ব্যাপারে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও শেখ হাসিনার প্রভাব বলতে গেলে অনেক বেশী। মার্চের প্রথম সপ্তাহে গনহত্যা আঁচ করতে পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ পূর্বাহ্নে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিকট সতর্ক বার্তা প্রেরণ করেন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে সংযোগ স্থাপন করেন। 

২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন পরবর্তী হত্যাযজ্ঞে সেনাবাহিনীর হাতে আত্মাহুতি দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন শিক্ষক; ১০১ জন শিক্ষার্থী, একজন কর্মকর্তা ও ২৮ জন কর্মচারী। ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিত যথা শিক্ষক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জোর্তিময় গুহ, সরাফত আলী সহ অনেকে নিহত হন। সেনাবাহিনী নিরীহ সরাফত আলীকে একটিভিষ্ট আবদুল মান্নান চৌধুরী মনে করে হত্যা করে, তথ্য বিভ্রান্তির কারনে এমনটা ঘটে। 

মার্চের প্রতিরোধ যুদ্ধের সাথে পেশাধার সৈনিক ও সশস্ত্র বাহিনীর সীমিত সংযুক্তি ছিল, ব্যাপক সংযুক্তি ছিল ছাত্রদের। তাদের সম্মুখ ভাবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার অধিভুক্ত কলেজ সমূহে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ভূমিকা। এই প্রতিরোধে সেনাবাহিনী, আনসার, ইপিআর বাহিনীর সাথে প্রশিক্ষিত মুজিব বাহিনী (সাবেক বিএলএফ) ও জয় বাংলা বাহিনীর সংযুক্তি হলেও এপ্রিলের প্রথম ভাগেই প্রতিরোধ অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। 

এপ্রিলের পর যুদ্ধটাকে চাঙ্গা রাখতে গণমাধ্যমের আশ্রয় নেয়া হয়। পূর্বাঞ্চল থেকে ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকা ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে যাদের প্রিন্টার লাইনে সম্পাদক হিসাবে আবুল হাসান চৌধুরী ও রহমতউল্ল্যাহর নাম প্রদর্শিত হয়। এ দুটো ছিল ছদ্মনাম। প্রথমোক্ত জন হলেন আবদুল মান্নান চৌধুরী ও শেষোক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র গুল হায়দার। পরবর্তীতে জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবদুল মান্নানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এমনকি বাংলার বাণী সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক যথাক্রমে শেখ ফজলুল হক মনি ও আমির হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অন্যান্য গনমাধ্যমের প্রায় সব সম্পাদক ও সেবক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রবৃন্দ। গনহত্যা শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পাকিস্তান সরকারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদেশে বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পরে তিনি অবশ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। 

২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর ব্যাপক মানুষজন সীমান্ত অতিক্রম করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৮ লাখ শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় পেলেও এক কোটির বাকীরা পূর্ব বাংলা থেকে পূর্বে হিজরতকারী এক কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে আশ্রয় নেন। শেষোক্তগণ বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি গঠন করে আশ্রায়ন ও মনস্তাত্বিক যুদ্ধ সম্প্রসারনের কাজে নিবেদিত শরনার্থী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীদের সার্বিক সহায়তা দেন। মুক্তির গানের সাথে কর্ণেল নুরুজ্জামানের স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুলতানা জামান জড়িত ছিলেন। ক্র্যাকডাউনের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আবদুল মান্নান চৌধুরী, অজয় রায়, মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, আবু জাফর, শহীদউদ্দিন আহমেদ সহ অনেকে সীমান্ত অতিক্রম করেন। তাদের কাউকে কাউকে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় চাকুরী দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত রাখা হয়। আবদুল মান্নান চৌধুরী সশস্ত্র সংগ্রামের সাথেই যুক্ত হয়ে যান। এপ্রিলের শেষভাগে শেখ মনির নেতৃত্বে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর পূণর্জাগরনের সময় থেকে তিনি মুজিব বাহিনীতে জড়িত ছিলেন। তাকে ভারতে শিক্ষকতার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। 

মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর বিশাল অবদান রয়েছে। শুধুমাত্র প্রশিক্ষণে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তা ও অস্ত্রের যোগান ছাড়া এই বাহিনীর সাথে ভারতীয় অন্য কোন বাহিনী যুদ্ধের প্রথম দিকে সংযুক্ত হয়নি। নিয়মিত বাহিনী ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সমঝোতার ক্ষেত্র হিসাবে তাদের অপারেশন এরিয়া সীমান্ত থেকে বিশ মাইল অভ্যন্তরে চিহ্নিত হয়। এপ্রিলের পর যখন পাকিস্তান বাহিনী বাংলাদেশে সামরিক কর্তৃত্ব কব্জা করে নেয় তখন মুজিব বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা জনযুদ্ধ চাঙ্গা রাখে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বিবৃত ও ব্যতিব্যাস্ত রাখার জন্য প্রতি ক্যাম্পের কাছাকাছি জায়গায় অন্তত: প্রতি রাতে একটি গুলি ছুড়ে দ্রুত স্থান বদলিয়ে ফেলতে থাকে। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার কাজেও ভূমিকা পালন করে। এই বাহিনীর মূল নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ। মুজিব বাহিনীর ৮৮ জন শীর্ষ নেতার একজন হিসাবে আবদুল মান্নান চৌধুরী দেরাদুনে মিলিটারী একাডেমীতে পুনঃপ্রশিক্ষণ নেন। তবে তিনি পূর্বাঞ্চল মুজিব বাহিনীতে শেখ মনির সহযোগী হিসাবে ভূমিকা পালন করেন। শেখ মনি নভেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে যাত্রা শুরুর পূর্বে তাকে পূর্বাঞ্চল কমান্ডের সার্বিক দায়িত্ব দেন। যুদ্ধ শেষাবদি তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। শেখ মনির নেতৃত্বাধীন মুজিব বাহিনী যৌথ বাহিনীর কোন ভূমিকা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম দখল করেন। মুজিব বাহিনীর বিশালাংশ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলমান শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ সমূহের সংসদ কর্মকর্তা। ক্যাম্পগুলো পরিচালনা, চিকিৎসা ও সেবা প্রদানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জড়িত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথেও তারা জড়িত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক বা বর্তমান শিক্ষার্থী। 

১১ সেক্টরের নেতৃত্বে বেশ ক’জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। ঢাকার বুকে ক্র্যাক ফ্লাটুন যে কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে বা দু:সাহসিক অভিযান পরিচালনা করেছে তার অধিকাংশ সদস্যই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ক্র্যাক ফ্ল্যাটুনের মোফাজ্জাল হোসেন চৌধুরী বা সাদেক হোসেন খোকার নাম সর্বজন বিদিত। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অসংখ্য যোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ ক’জন বীরউত্তম খেতাবধারী যেমন লেঃ সামাদ, আফতাবুল ইসলাম ও খাজা নিজামউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে খাজা নিজামউদ্দিনই একমাত্র সিভিলিয়ান বীর উত্তম। 

এদিকে ঢাকা বসবাসকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর একাংশ দলাদলীতে রেকর্ড সৃষ্টি করলেও অন্য অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, চিকিৎসা দিয়েছে, চোখ কানের ভূমিকা পালন করেছে, শত্রু আবস্থান ছিনিয়ে দিয়েছে কিংবা গোপনে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করে যুদ্ধের ধারাটা অব্যাহত রেখেছে। বেশ ক’জন শিক্ষক যুদ্ধকালীন অবস্থায় পাকিস্তানী রাও ফরমান আলীর মৃত্যু সংকেত পেলেও যুদ্ধে জড়িয়ে থাকেন। তাদের একাংশ রাজাকার আলবদর আলসামসের হাতে নির্মম ভাবে নিহিত হয়েছেন। 

মুক্তিযুদ্ধে সেনাপ্রধান এমএজি ওসমানীর এডিসি ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কৃতি সন্তান শেখ কামাল। শেখ জামালও মুজিব বাহিনীর হয়ে প্রশিক্ষন নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। উপরাষ্ট্রপতির সন্তান সৈয়দ আশরাফও মুজিব বাহিনীর যোদ্ধা। বিদেশে কর্মরত থেকেও যারা পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করেন ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে অংশ নেন তাদের মধ্যে এ এম মোহিতের ন্যায় অনেকেই ছিলেন আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থী। 

মুজিব নগর সরকারের কার্যক্রমে বেশ কিছু শিক্ষক জড়িত ছিলেন। প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদ, রেহমান সোবহান, সারোয়ার মোর্শেদ, আনিছুর রহমান ও আনিসুজ্জামান ছিলেন প্লানিং কমিটির সদস্য। ড. আনিসুজ্জামান ও অজয় রায় যথাক্রমে ছিলেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আমিরুল ইসলাম ছিলেন মুজিব নগর সরকার গঠন উপলক্ষে প্রণীত ঘোষনার প্রনয়নকারী। 

মুজিব নগর সরকারের রাষ্ট্রপতি জাতির জনক ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, আবদুস সামাদ আজাদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কৃতি শিক্ষার্থী। বর্ণনা দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছে তাই সম্প্রসারিত না করে সৈয়দ আবুল মকসুদের একটি উত্তি দিয়ে শেষ করা যায় তাহলো “বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-গরিমায় যেমন অনন্য তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ও বিকাশে তার ভূমিকা ঈর্ষনীয় তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের তার ভূমিকা হচ্ছে সার্বিক। যে দেশের জাতির পিতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র, তাদের গর্বের ভান্ডারটি সুবিস্তৃত। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ভান্ডারটি আরও সমৃদ্ধশালী করা।”

 

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী,
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা

উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 

 

ট্যাগ: bdnewshour24 অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ উপাচার্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ