banglanewspaper

পপি চৌধুরী:নিজের লেখা বই ছাপাতে গিয়ে প্রতারিত হয়ে ২০০৫ সালে গড়ে তুলেছিলাম নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান “প্রীতম প্রকাশ”। ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছি অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। প্রকাশনা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকলেও একাকী নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে এগিয়ে নিয়ে এসেছি ২০১৯ সাল পর্যন্ত।

প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনশ-র অধিক । নিজের প্রথম বই ছাপার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে নতুনদেরকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করে এসেছি সবসময়। নতুনদের পাশাপাশি লেখক সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ড. আশরাফ সিদ্দিকীর ন্যায় অনেক নামকরা লেখকের বইও প্রকাশিত হয়েছে আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে।

প্রকাশকদের সংগঠন পুস্তক প্রকাশক সমিতি এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি- এই দুটি সংগঠনেরই সদস্য আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান "প্রীতম প্রকাশ"। বাংলাবাজারে নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে ক্রয় করা একটি দোকানও আছে। ২০০৮ সাল থেকে নিউইয়র্কে মুক্তধারা আয়োজিত বইমেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছে প্রীতম প্রকাশ (কেবলমাত্র ২০১৮ ব্যতীত)।

তবে যতবার আমি নিজে সশরীরে নিউইয়র্ক বইমেলায় অংশ নিয়েছি প্রতিবারই একজন নারী প্রকাশক হিসেবে আমার প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ্য করেছি। এর পূর্বে ২০১৫ সালে মেলার ২য় দিনে সকাল বেলা লেখক-প্রকাশকদের একটি আড্ডা ছিল। বইয়ের দোকান ঢেকে রেখে সেখানে সবার অংশগ্রহণ ছিল বাধ্যতামূলক। তাই আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম একমাত্র নারী প্রকাশক হিসেবে।

অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছিলেন প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশের একজন পরিচিত ছড়াকার। তিনি উপস্থিত সকল পুরুষ প্রকাশকদের ২/৩ বার করে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিলেও আমি কিছু বলার জন্য বেশ কয়েকবার হাত তুললেও তিনি আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেননি। তা লক্ষ্য করে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার তাকে বলেন মাইক্রোফোনটি আমাকে দেয়ার জন্য, কিন্তু তারপরও ঐ ছড়াকার আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেননি।

তার সাথে আমার কখনও কোন বিরোধ ছিল না, বরং তিনি আমাকে একজন প্রকাশক হিসেবে ভালো করেই চিনতেন। তার এই আচরণে সেদিন আমি কষ্ট পেয়েছিলাম এবং অনুষ্ঠান শেষে আমি তার এই আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। তাদের এই বৈষম্যমূলক আচরণের পরও বইমেলায় অংশগ্রহণ করেছি শুধুমাত্র বইয়ের প্রতি ভালোবাসার টানে। তবে এরপর মঞ্চ কিংবা আলোচনা সভা এড়িয়ে চলেছি সবসময়।

এবারও আমার সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে । মেলার ৩য় দিন দুপুর বেলা মেলা কমিটির দুজন এসে আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিয়ে যান। সারাদিন বই নিয়ে তীর্থের কাকের মত বসে থাকলেও সন্ধ্যা সাতটার দিকে যখন মেলাস্থানটিতে কিছু দর্শক সমাগম হয়েছে ঠিক তখনই মেলা কমিটির একজন সব প্রকাশককে ডাকতে এলেন উপরে যাওয়ার জন্য।

কারণ এবার মেলায় আগত প্রকাশকদের মধ্য থেকে একজনকে পুরস্কৃত করা হবে। না গেলেও একটু পরে আবারও মেলা কমিটি থেকে আরেকজন ডাকতে আসেন এবং বলেন মাত্র ১০ মিনিটের জন্য সকল প্রকাশককে উপরের অনুষ্ঠানস্থলে যেতে হবে। এরপর অনেকটা বাধ্য হয়ে উপরে যাই।

উপরে যাওয়ার পর এক এক করে সকল প্রকাশক এবং তাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করে তাদের মঞ্চে ডাকেন নিউ ইয়র্কের পরিচিত লেখক হাসান ফেরদৌস। সেখানে প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকদের পাশাপাশি এমন অনেক প্রকাশকও ছিলেন যাদের প্রকাশনার বয়স এখনও দুবছর হয়নি। তাদেরকে মঞ্চে ডাকা হলেও একটিবারও আমার নাম কিংবা ১৫ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম নেওয়া হয়নি।

দর্শকসারীতে অনেক নামকরা সাংবাদিক, পত্রিকার সম্পাদক এবং একসময়ের প্রতিষ্ঠিত নারী-সাংবাদিকও উপস্থিত ছিলেন যারা দীর্ঘদিন থেকে আমাকে প্রকাশক হিসেবে চিনেন তারাও এ বিষয়ে কিছু বললেন না। বিষয়টি আমাকে খুবই মর্মাহত করে।

যখন মঞ্চের কাজ শেষে সকলে মঞ্চ থেকে নামতে যাবেন তখন এগিয়ে যাই মঞ্চের দিকে। এক মিনিট কথা বলার সুযোগ চাই আমি। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক লেখক হাসান ফেরদৌস বার বার বলতে থাকেন- “না না আপনি এভাবে মঞ্চে আসতে পারেন না... এভাবে কিছু বলতে পারেন না।” আমি বুঝে যাই, ওনারা আমাকে কথা বলার সুযোগ দেবেন না। তখন আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বলি, “আপনারা অন্য প্রকাশকদের সাথে আমাকে নীচে থেকে উপরে ডেকে এনেছেন, সকল প্রকাশককে মঞ্চে ডেকেছেন অথচ একটিবার আমার নাম বা আমার প্রকাশনার নামটি উচ্চারণ করার প্রয়োজন মনে করলেন না, সেকী আমি নারী বলে? আপনারা আমাকে একজন প্রকাশক হিসেবে উপযুক্ত সম্মান দিলেন না তাই আজ থেকে এই বইমেলা বর্জন করলাম আমি।”

এরপর আমি নীচে এসে এই বইমেলার মূল আয়োজক মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিত সাহাকে বলি, “দাদা, আপনি যদি আমাকে প্রকাশকই মনে না করেন তাহলে আর কখনও আমায় ডাকবেন না বইমেলায় অংশ নিতে।” তারপর আমি চলে যাই আমার স্টল গোটাতে।

 একটু পরে বিশ্বজিত সাহা এসে রাগত ভাবে ধমকের সুরে বার বার বলতে থাকেন- “আপনি কাজটি ঠিক করেন নি এভাবে ওখানে (উপরে) কথা বলে।” আমি বলি- “আপনারা আমাকে ডেকে নিয়ে একজন নারী হিসেবে বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন আর আমি তার প্রতিবাদ করায় এখন বলছেন আমি অন্যায় করেছি !” আমার একথার জবাবে বিশ্বজিত সাহা অসৌজন্যমূলক ভাবে বলেন “আপনি নারী নিয়ে ব্যবসা করবেন না।”

বিশ্বজিত সাহা সবসময় প্রচার করে বেড়ান যে প্রবাসে তিনি দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার কাজ করছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, যে মানুষ বা যে সংগঠনটি একজন নারীকে সঠিক সম্মান দিতে জানে না সে কিভাবে দেশের সংস্কৃতি প্রবাসে তুলে ধরার প্রতিনিধিত্ব করেন!

তার আরো কিছু বৈষম্যমূলক আচরণের কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই:

বাংলাদেশ থেকে যে সকল প্রকাশক এবার বইমেলায় অংশ নিতে এসেছেন তাদের জন্য স্টল ফ্রি হলেও আমার কাছে ৫০০ ডলার স্টল ভাড়া চাওয়া হয়, বলা হয় আমি যেহেতু নিউ ইয়র্কে থাকি তাই আমাকে এই ভাড়া দিতে হবে। অথচ আমার প্রকাশনাটি বাংলাদেশে অবস্থিত, সেখানে আমার নিজস্ব একটি দোকান আছে এবং একজন কর্মচারীও আছে।

এই বইমেলা উপলক্ষ্যে ৬০ কেজি বই আনতে বিশ্বজিত সাহাকে দিতে হয়েছে ২১৫ ডলার। অনেক বাদ-প্রতিবাদের পর ১০০ ডলার ডোনেশন দেয়ার বিনিময়ে আমাকে স্টল দেয়া হয়। এদেশে নির্ধারিত ছুটি ছাড়া ছুটি নিলে বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়, তারপরও বইমেলায় অংশ নেওয়ার জন্য আমাদের কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়েছিলাম।

কিন্তু আমার বইয়ের স্টলটি দেয়া হয়েছিল একেবারে শেষপ্রান্তে শাড়ি-কাপড়ের দোকান ঘেষে। মেলা কমিটির এসকল আচরণ আমাকে বিব্রত ও মর্মাহত করেছে। আমার প্রতি করা তাদের সকল অন্যায়ের প্রতিবাদ স্বরূপ ততক্ষনাৎ আমি এই মেলা বর্জন করে মেলাস্থল থেকে আমার প্রকাশনার স্টলটি গুটিয়ে নিয়ে চলে আসি।

লেখক

পুস্তক প্রকাশক ও পত্রিকা-সম্পাদক

ট্যাগ: bdnewshour24 নারী প্রকাশক