banglanewspaper

মনির হোসেন জীবন, নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা গাজীপুর। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও গাজীপুর জেলার ব্যাপক পরিচিত ও সুনাম রয়েছে। শিল্পাঞ্চল খ্যাত গাজীপুরে রয়েছে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

দেশের বেশিরভাগ জেলার মানুষের বসবাস এই গাজীপুর জেলায়। ফলে দিনদিন গাজীপুর জেলার গুরুত্ব বেড়েই চলেছে।

গাজীপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো কালিয়াকৈর। এ উপজেলায় বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানান উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। উপজেলায় শিক্ষাক্ষেত্রেও হয়েছে অভাবনীয় উন্নয়ন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মানউন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য প্রযুক্তির ও উন্নত মানের পরিবেশে নিশ্চিতকরণসহ আরো অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়ার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত এখন কালিয়াকৈর উপজেলাবাসী।

তবে সরকারের নজিরবিহীন উন্নয়নের বিপরীতে কতিপয় অসাধু ব্যাক্তি কালিয়াকৈর উপজেলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘হযবরল’ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কোন প্রকার নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠছে নামে বেনামে কিন্ডার গার্ডেন, কেজি স্কুল, নিন্ম-মাধ্যমিক স্কুল। অনুমতি না থাকলেও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যানার, বিলবোর্ড, ফেস্টুন ইত্যাদি উপজেলার অলি গলিতে দেখা যায়।

অথচ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই নেই কোন নিজস্ব ক্যাম্পাস, নেই খেলার মাঠ, নেই মান সম্মত ভবন। বাসা ভাড়া ঝুকিপূর্ণ ভাবে পাঠদানের অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠান ও অনুমতি না পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও চালিয়ে যাচ্ছে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম।

অনুমোদনহীন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কিভাবে চলে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই পাওয়া যায় অভিভাবক ও সচেতন মহলের কাছে। তাদের উত্তর হলো-প্রশাসনের যোগসাজসেই দিনের পর দিন অবৈধভাবে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলে।

কেবল মাত্র অনুমতির জন্য আবেদন করেই দায় সাড়া যেন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষার কোন পরিবেশ কিংবা বোর্ডের নিয়ম মাফিক না চললেও এসব প্রতিষ্ঠানের ‘নিশ্চিত এ প্লাস, নিশ্চিত পাশ, আমরাই সেরা’ ইত্যাদি লেখা সম্বলিত ব্যানারে ছেয়ে আছে উপজেলার বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, অলি গলি।

দিনের পর দিন এমন চলতে থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সমাজের সচেতন মহলের অভিযোগের তীর প্রশাসনের দিকেই। শিক্ষা খাতকে বাণিজ্যিক করণের দৌড়ে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্তাব্যাক্তি জড়িত বলে অভিযোগ অভিভাবক, এলাকাবাসী, শিক্ষার্থীসহ সকলের।

খোঁজ নিয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলায় মোট ৪৫টি মাধ্যমিক, ৮টি মাদ্রাসা ও ৮টি স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে। চলতি বছর আরো ৮টি কিল্ডারগার্ডেন এবং কেজি স্কুলকে নিন্ম মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। এর মধ্যে গ্রামবাংলা বিদ্যালয়, রোজগার্ডেন মডেল স্কুলসহ তিনটি স্কুলের অনুমতি পত্র উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে পৌঁছেছে।

তবে এবিসি মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মৌচাক মডেল স্কুল, ট্যালেন্টপুল প্রি-ক্যাডেট এন্ড হাই স্কুল, জেনিথ প্রি.এল কেজি এন্ড হাই স্কুলসহ আরো পাঁচটি স্কুল পাঠদানের অনুমতি পেলেও তাদের অনুমতিপত্র পত্র উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে এসে পৌঁছেনি। এ ছাড়াও উপজেলা থেকে আরও প্রায় ৫০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নি¤œমাধ্যমিক শিক্ষা পাঠদানের অনুমতি চেয়ে শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কালিয়াকৈর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কয়েক’শ কিন্ডার গার্ডেন ও কেজি স্কুল গড়ে উঠেছে। কোন প্রকার পাঠদানের অনুমতিহীন এসব প্রতিষ্ঠান অভিভাকদের বোকা বানিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।

পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনুমোদিত অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ করানো হয়। বিপরীতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয় মোটা অংকের টাকা।

কে কার আগে পাঠদানের অনুমতি পাবে এমন প্রতিযোগিতা হয় এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। পাঠদানের অনুমতি পেলেই যেন তাদের রমরমা শিক্ষা বাণিজ্যের পথ আরো মজবুত হয়। যার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান খুলতে না খুলতে অনুমতি প্রতিযোগীতায় মেতে উঠে কর্তৃপক্ষ।

গত এক বছরে গ্রামবাংলা বিদ্যালয়, রোজগার্ডেন মডেল স্কুল, এবিসি মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মৌচাক মডেল স্কুল, ট্যালেন্টপুল প্রি-ক্যাডেট এন্ড হাই স্কুল, জেনিথ প্রি.এল কেজি এন্ড হাই স্কুলসহ আটটি স্কুল নিন্ম-মাধ্যমিক পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া অধিকাংশ শর্তই পূরণ করেনি।

এসব প্রতিষ্ঠানের নেই কোন নিজস্ব জমি, শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ভাড়া বাসায়। বোর্ডের শর্ত পূরণ না হলেও তিন বছরের জন্য নি¤œ-মাধ্যমিক পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলে অভিযোগ এলাকাবাসী ও সমাজের সচেতন মহলের। 

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনের নিচ তলায় ফ্যামিলি বাসা, উপর তলায় স্কুল, পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষার্থীদের চলাচলের রাস্তাও নেই। ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান। ছোট ছোট শ্রেনীকক্ষ তার সাথে রয়েছে টয়লেট, সেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধও। অধিকাংশ স্কুলে নেই খেলার মাঠ, রাস্তায় চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এসব কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, স্কুল পরিদর্শনে আসা শিক্ষা বোর্ড ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই পাঠদানের অনুমতি পেয়েছেন। অনুমতি পেতে সব মিলিয়ে প্রতিটা স্কুলকে আড়াই লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকুচ দিতে হয়েছে। 

তবে শিক্ষা পরিবেশহীন কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঠিক কতটুকু শিক্ষা লাভ গ্রহণ করবে শিক্ষার্থীরা? কিভাবেই বা তাদের মেধার বিকাশ ঘটবে এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘নিজস্ব জমিসহ যে সব শর্ত রয়েছে, নিন্ম মাধ্যমিক পাঠদানের অনুমতি পেতে সেসব শর্ত পূরণ করতে হবে। তবে বোর্ড কর্তপক্ষ যে প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য মনে করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানকেই অনুমতি দিয়েছেন।’

ট্যাগ: bdnewshour24 কালিয়াকৈর শিক্ষা বানিজ্য