banglanewspaper

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ভুয়া শিক্ষা সনদ, রেজুলেশন ছাড়াই মাদরাসার গাছ কর্তন, ও জমি বিক্রি, জালজালিয়াতি করে কমিটি গঠন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রাতিষ্ঠানিক কর্যক্রম চালানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার একাধিক আলিয়া মাদরাসা গুলোর বিরুদ্ধে। কিন্তু এসব অভিযোগের পরও অদৃশ্য কারনে অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করে থাকতে দেখা গেছে প্রশাসনের।

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার বিন্দুবাড়ী গাউছুল আজম সিনিয়র মাদরাসা, চিনাশুকানিয়া সিনিয়র মাদরাসা, গাড়ারণ খলিলিয়া ফাজিলা মাদরাসা, গাজীপুর সিনিয়র মাদরাসা, সাগরিয়া বালিকা দাখিল মাদরাসা ও পটকা সিনিয়র মাদরাসায় এসব অনিয়মের বিষয়ে জানা যায়।

১ম পর্ব- বিন্দুবাড়ী গাউছুল আজম সিনিয়র মাদরাসার অনিয়মঃ

বিন্দুবাড়ী গাউছুল আজম সিনিয়র মাদরাসায় কমিটি গঠনে অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ, সনদ জালজালিয়াতি, চাকুরিরত থাকা অবস্থায় নিয়মিত সনদ গ্রহণ, রেজুলেশন ছাড়াই মাদরাসার গাছ কর্তন, ইন্ডেক্সধারী হয়েও অন্য বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনা করা,নৈশ প্রহরীর এককালিন টাকা উত্তোলনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এবং প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন সময়ে দেয়া হলেও তার কোন সুফল পাওয়া যায় না বলে জানায় নাম প্রকাশে একাধিক ভুক্তভোগী।

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও অবৈধ ভাবে বেতন উত্তোলন সংক্রান্ত বিষয়ে গত ২২ আগস্ট অত্র প্রতিষ্ঠানের এক অভিভাবক বাদী হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো: দেলোয়ার হোসেন বিন্দুবাড়ী গাউসুল আজম সিনিয়র মাদরাসায় ২০০৪ সালের দিকে সহকারী শিক্ষক শরীরচর্চা হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে ইন্ডেক্স নং- ২০১৯৮৬৫ দ্বারা নিয়মিত বেতন উত্তোলন করে আসছে। কিন্তু তিনি ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ইং তারিখে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে চাকরী থেকে পদত্যাগ করে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ চলে যায় এবং তার পদত্যাগ পত্র অত্র মাদরাসায় রেজুলেশনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। তারপর থেকে শিক্ষক হাজিরা খাতায়ও তার নাম উঠানো হয় নাই বা তার স্বাক্ষর নাই। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে একাধিক অডিট ও জরিপ গুলোতে দেলোয়ার হোসেন এর পদটি (সহকারী শিক্ষক শরীরচর্চা) শূন্য দেখানো হয়। এদিকে ২০১২ সালের ৬ জুন তারিখে “দৈনিক কালের কন্ঠ” পত্রিকায় ৩য় বারের মতো বিধি মোতাবেক শূন্য পদে উক্ত মাদরাসায় ইংরেজী ও সহকারী গ্রন্থাগারীক পদ দুটির সাথে শরীরর চার্চা বিষয় পদটিতেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। কিন্তু পূর্বের ইন্ডেক্স নাম্বার ব্যবহার করে ২৯ জুন ২০১২ তারিখে তৎকালিন ম্যানিজিং কমিটির সভাপতির যোগসাজসে ও অত্র মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা শাহাব উদ্দিনের অপকৌশলে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবৈধভাবে দেলোয়ার হোসেনকে শরীরচার্চা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেখানো হয়।

উল্লেখ্য যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক ৬ মাসের অধিক ইন্ডেক্সের কার্যকারিতা থাকে না। তাহলে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিদেশে থেকে পূনরায় দেলোয়ার হোসেন কিভাবে শরীরচার্চা শিক্ষক হিসেবে এখনও বহাল থাকার ব্যাপারে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। এছাড়াও পরবর্তীতে দেলোয়ার হোসেন তার নিয়োগের কাগজপত্র দেখিয়ে অবৈধভাবে সরকারী কোষাগার থেকে নিয়মিত ভাবে বেতনের টাকা উত্তোলন করে আসছে বলেও জানা যায়। 

অন্যদিকে বেতনের সাথে চাকুরীর নির্দিষ্ট বয়সসীমা অতিক্রম হওয়ার পূর্বেই টাইম স্কেল নিয়ে সরকারের অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে আসছে বলেও জানায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকরা। 

অবৈধ নিয়োগ, সরকারী কোষাগার থেকে নিয়মিতভাবে বেতনের টাকা উত্তোলন ও চাকুরীর নির্দিষ্ট বয়সসীমা অতিক্রম হওয়ার পূর্বেই টাইম স্কেল গ্রহণ সম্পর্কে বক্তব্য নেয়ার জন্য বিডিনিউজ আওয়ারের এই প্রতিবেদক সহকারী শিক্ষক শরীরচর্চা মো: দেলোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও চাকুরিরত থাকা অবস্থায় নিয়মিত সনদ গ্রহন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিন্দুবাড়ী গাউসুল আজম সিনিয়র মাদরাসার তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা শাহাব উদ্দিন বিডিনিউজ আওয়ারকে বলেন, আমার সনদ নিয়মিত নয়। আমার সময়ে কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় নাই। এসব বিষয়ে তখনকার সভাপতি বলতে পারবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য বিন্দুবাড়ী গাউসুল আজম সিনিয়র মাদরাসার তৎকালিন সভাপতি ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কমর উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্ঠা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রেজুলেশন ছাড়াই মাদরাসার গাছ কর্তন ও সরকারী বই বিক্রি, নৈশ প্রহরীর এককালিন টাকা উত্তোলনে দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এসব অস্বীকার করে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, নিয়োগের বিষয় অনেক আগের ঘটনা। তাই না জেনে এগুলো সম্পর্কে বলতে পারবো না। পরে যোগাযোগ করেন ।

বিন্দুবাড়ী গাউসুল আজম সিনিয়র মাদরাসার বর্তমান সভাপতি মিজানুর রহমান মনির বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, কোন অনিয়মকে নিয়মে পরিনত হতে দেয়া যাবে না। পূর্বে কি হয়েছে তা আমি বলতে পারবোনা তবে বর্তমানে কোন দুর্নীতিকে গ্রহন করা হবেনা।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হবে। তদন্তের পর অনিয়মের প্রমান পাওয়া গেলে যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া গ্রহন করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ শামছুল আরেফীন বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

গাজীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা বিডিনিউজ আওয়ারকে জানান, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই আইনের বাইরে নয়। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ভুয়া শিক্ষা সনদ, জালজালিয়াতি করে কমিটি গঠন সংক্রান্ত বিষয় গুলো সম্পর্কে সুনিদিষ্ঠ অভিযোগ থাকলে  তদন্ত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ট্যাগ: bdnewshour শ্রীপুর