banglanewspaper

 

সরকারি হিসাব মতে,বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি পরীক্ষায় সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তীব্রতা লাভ করে আরো পরে।

২০১৪ সাল থেকে পিএসসি, জেএসসি, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মতো বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি পরীক্ষারও প্রশ্ন ফাঁস শুরু হয়। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ একাধিকবার এসেছে।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সব কয়টি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও সরকার কর্তৃক বরাবরই এই দাবি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। এর কিছুদিন পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রশ্ন ফাঁসে দোষীদের পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের শিগগিরই চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন।

২০১৪ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি প্রশ্ন ফাঁস হলে পরীক্ষাটির তারিখ পরিবর্তন করা হলেও, অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পরেও এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

এরপর থেকে অনুষ্ঠিত সব কয়টি পাবলিক পরীক্ষারই প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকে। এ ব্যাপারে সরকার থেকেও একেক সময় একে ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কখনো এই দাবি সম্পূর্নভাবে অস্বীকার করা হয় আবার কখনো আগের চেয়ে কম হারে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয়। এছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষকদেরকেও প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত বলে মন্তব্য করেন।

২০১৫ সালের মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ উঠে। এ ব্যাপারে তীব্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে একটি গণতদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এই কমিটি ২০১৫-১৬ সেশনে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সত্য বলে রিপোর্ট করে এবং নতুন করে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সুপারিশ করে। প্রশ্নফাঁসের বিপক্ষে পুনরায় পরীক্ষার জন্য একদল শিক্ষার্থী আন্দোলন করলেও সেই আন্দোলন সফল হয়নি।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ মতে নতুন করে কোন পরীক্ষা নেয়া হয়নি বরং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সরকারের পক্ষ থেকে অযৌক্তিক বলা হয়ে এসেছে। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আনা হয়।

পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁস হওয়া এই প্রশ্নেই স্নাতক শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ হলে সমালোচনা তীব্রতা লাভ করে। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ঘটনা অস্বীকার করেছে।

সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী প্রধান হচ্ছেন মন্ত্রী। তার নির্দেশ পালন করেন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। যদিও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেন মন্ত্রীরা, আমলারা নিজেদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে মন্ত্রীদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

তারপরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে, মন্ত্রীর স্বাক্ষরেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তাই যেকোন মন্ত্রণালয়ের সফলতা বা ব্যর্থতার দায়ভার চাপে মন্ত্রীর কাঁধে। সফলতার জন্য বাহবা না পেলেও ব্যর্থতার জন্য সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পান না কোনো মন্ত্রী। তবে উন্নত এবং অনুন্নত বিশ্বে এই চিত্র ভিন্ন হয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে নানামহলে আলোচনা সমালোচনা চলছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষা, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। এসএসসির সকল প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যা পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে হুবহু মিলে গেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম পদক্ষেপ নেয়া হলেও রোধ করা যাচ্ছে না প্রশ্নপত্র ফাঁস। সরকারি প্রেস, যেখানে প্রশ্নপত্র ছাপানো হয় সেখানাকার কর্মচারী, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, স্কুল এবং কলেজের শিক্ষকসহ বেশ কিছু সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক করেও ফল হয়নি। ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত সন্দেহে কয়েকজন শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আটককৃতরা বিগত কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস করছিল বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। প্রশ্নফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারেরও কথা ঘোষণা করেন তিনি। এরপর পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে এগিয়ে এসেছে মহামান্য হাইকোর্টও। প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের খুঁজে বের করতে ও প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণে বিচার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক কমিটি গঠন করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এতকিছুর পর এখন পর্যন্ত ঠেকানো যায়নি প্রশ্ন ফাঁস।

যেহেতু একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে এবং সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে মন্ত্রণালয়, তাই স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের দাবী উঠেছে। রাজনৈতিক, শিক্ষাবিদসহ সুশীল সমাজে এ দাবি জোরালো হচ্ছে। এমনকি সরকারের শরীক জাতীয় পাটিরএক নেতা সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

কিন্তু তবুও ক্ষমতা ও পেশিশক্তির চরম লালসা মন্ত্রীদের মাঝে। লাগামছাড়া ব্যর্থতার মুখোশ উন্মোচন হবার পরও বেহায়া হয়ে অটল থাকেন অভিশপ্ত আসনে জাতির জন্য বিষফোঁড়া হয়ে।

সুতারাং প্রশ্নফাঁসের এ লাগামহীনতায় নতুন প্রজন্মের মাঝে  ভবিষ্যতে আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন, দুর্নীতি অনিয়মে জর্জরিত, নৈতিকতা বিবর্জিত, জবাবদিহিতার পাশ কাটিয়ে যাওয়া, অধিকার আদায়ে অচেতন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশূণ্য একটি বাগড়ম্বরতার ছায়া দেখতে পাই।

লেখক

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

ট্যাগ: bdnewshour24 প্রশ্নফাঁস