banglanewspaper

হঠাৎ বিকট শব্দ। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে থেমে যায় ট্রেন। ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা আঁতকে উঠে। হুড়াহুড়ি শুরু করে। ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে। অনেকে ভেতরে আটকা পড়ে। যাত্রীদের গগনবিদারী চিৎকার। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে রেললাইনের আশপাশের এলাকার মানুষেরও। তারা ছুটে এসে দেখে, দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ট্রেনের বগি থেকে কাতর আর্তনাদ ভেসে আসছে। তারপর একে একে উদ্ধার করা হয় ৯টি লাশ। আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে, যেখানে মারা যায় আরো সাতজন।

গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে দুটি ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে এই ১৬ যাত্রী। আহত হয়েছে আরো অন্তত শতাধিক যাত্রী। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী আন্ত নগর উদয়ন এক্সপ্রেসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী আন্ত নগর তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। হতাহতদের প্রায় সবাই উদয়নের যাত্রী।

যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটল : রেলওয়ে স্টেশন, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তূর্ণা নিশীথা রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাত্রা করে। ট্রেনটিকে আউটারে থামার জন্য সংকেত দেওয়া হয়। আর উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করার পথে ট্রেনটিকে প্রধান লাইন ছেড়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেওয়া হয়। রাত ২টা ৫৫ মিনিটে উদয়ন স্টেশনে ঢোকে। ট্রেনটির ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করে ট্রেনটির মাঝামাঝি ঢুকে পড়ে। এতে উদয়নের তিনটি বগি দুমড়েমুচড়ে যায়। পরে তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটির চালক তাহের উদ্দিন ইঞ্জিন চালু রেখে পালিয়ে যান।

মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার জাকির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, তূর্ণা নিশীথার চালক সংকেত অমান্য করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

রেলপথ মন্ত্রীও ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে তূর্ণা নিশীথার চালককে দায়ী করেন। তবে রেলপথ সচিব মো. মোজাম্মেল হোসেন জানান, তদন্ত না করে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, রাতে প্রচুর কুয়াশা ছিল। তূর্ণা নিশীথার চালক হয়তো কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে পাননি। চালক তাহের উদ্দিনও সিগন্যাল দেখতে পাননি বলে স্বীকার করেছেন। 

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে তূর্ণা নিশীথার চালক তাহের উদ্দিন, সহকারী চালক অনুপ দেব, পরিচালক (গার্ড) আব্দুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুটি, রেল বিভাগ থেকে দুটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা ও আহতদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে প্রায় আট ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি বগিসহ সাতটি বগি বাদ দিয়ে ৯টি বগি নিয়ে সকাল ৭টার দিকে উদয়ন এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। তূর্ণা নিশীথা ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সকাল পৌনে ৯টার দিকে। রেলওয়ে সূত্রের বরাত দিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানায়, উদয়ন এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে গিয়ে পৌঁছায়।

রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনচালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

পরিচয় মিলেছে ১৫ জনের : নিহতের মধ্যে ঘটনাস্থলেই ৯ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে দুজন, কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, ছয়জন নারী ও চারটি শিশু। তাদের মধ্যে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতরা হলো চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাজারগাঁওয়ের আবদুল জলিলের ছেলে মজিবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী কুলসুম বেগম, একই জেলার কাকলী, ফারজানা বেগম ও মরিয়ম বেগম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বুল্লা গ্রামের ইয়াছির আরাফাত, সৈয়দাবাদ এলাকার রিপন মিয়া, হবিগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা ও জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি আলী মোহাম্মদ ইউসুফ, একই জেলার চুনারুঘাট উপজেলার তীরেরগাঁওয়ের সুজন আহমেদ ও পেয়ারা বেগম, বানিয়াচং উপজেলার মো. আল-আমিন, আদিবা ও সোহা মনি, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার গাজীপুরের জাহেদা খাতুন, নোয়াখালীর মাইজদীর রনি হরিজন ও আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী। তাঁর লাশ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে বলে জানা গেছে। বাকি সবার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের যাত্রী কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার কাজী ফজলে রাব্বি সাংবাদিকদের জানান, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। এ সময় বিকট শব্দ হয় ও প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। তিনি নেমে গিয়ে দেখেন যাত্রীদের গগণবিদারী চিৎকার। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তিনিও উদ্ধারকাজে অংশ নেন। তবে প্রচণ্ড কুয়াশা থাকায় উদ্ধারকাজে সমস্যা হচ্ছিল।

তূর্ণার যাত্রী ওষধু কম্পানির কর্মকর্তা প্রাণ গোপাল বলেন, ‘প্রচণ্ড জোরো ধাক্কা লাগার পর সিট থেকে ওপরের দিকে উঠে যাই। এতে অনেক যাত্রী আহত হয়।’

উদয়ন এক্সপ্রেসের যাত্রী সিলেটের জালালাবাদ এলাকার ফরহাদ আহমেদ আহত হয়ে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের একপাশে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি বগির ভেতরে আটকা পড়ে যাই। স্থানীয় লোকজন আমাকে উদ্ধার করে।’ 

মানুষ মানুষের জন্য : দুর্ঘটনার পর থেকেই এগিয়ে আসে স্থানীয় লোকজন। ভোর থেকেই মসজিদের মাইকের ঘোষণা দিয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়। শুরুতে স্টেশনের সামনে থাকা পিকআপ ভ্যান দিয়ে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।

রেললাইনের পার্শ্ববর্তী চান্দখোলা গ্রামের মো. সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিকট শব্দে ঘুম ভাঙলে স্টেশনের দিকে ছুটে আসি।’

বায়েক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কসবা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্ভোগের শিকার যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া যাত্রীদের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হয়। 

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়ত-উদ-দৌলা খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার চেষ্টা চালানো হয়।’

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, উদ্ধারকাজসহ অন্যান্য বিষয়ে তদারকি করে পুলিশ।

সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম জানান, তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পাঁচটি মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে সর্বাত্মক সেবাদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. নুরুল ইসলাম জানান, ট্রেনের ভেতর থেকে বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

কসবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রাশেদুল কায়সার ভূঁইয়া জানান, কসবার বাসিন্দা আইনমন্ত্রী আনিসুল নির্দেশনায় তাঁরা দুর্গতদের সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

তিন ঘণ্টা পর বেরোলো শিশুর টুকরো দেহ : সকাল ৬টা ২০। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উদয়ন এক্সপ্রেসের ‘ঝ’ বগিটি উদ্ধারকারী ট্রেনের মাধ্যমে রেললাইন থেকে সরানো হয়। এর পরই দেখা মেলে মানবদেহের কয়েক টুকরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এক এক করে কুড়িয়ে বিশেষ ব্যাগে নিয়ে রাখেন টুকরাগুলো। উদ্ধারকারীরা জানান, দেহটি শিশুর। এ সময় অনেকের চোখ ছলছল করে ওঠে।

স্বামীকে দাফন শেষে নিজেই লাশ : বায়েক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় লাশের সারি। এক-এক করে আসা স্বজনরা লাশ শনাক্ত করছে। বিদ্যালয় ভবনের সামনেই চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছিল এক বৃদ্ধের। কথা বলতে পারছিলেন না। আহমদ আলী নামের এক যুবক জানালেন, দুর্ঘটনায় নিহত জাহেদা বেগমের বাবা তিনি। জাহেদার স্বামী মারা গেছেন গত ৭ নভেম্বর। চট্টগ্রামে জাহাজ দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। স্বামীর দাফন ও কুলখানি শেষে শ্রীমঙ্গল থেকে চট্টগ্রাম ফিরছিলেন পরিবারের চার সদস্য।

কথা হয় চাচা মুজিবুর রহমান ও চাচি কুলসুম বেগমকে হারানো শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার কাজে তাঁরা শ্রীমঙ্গল থাকতেন। কিস্তির টাকা পরিশোধ করার জন্য তাঁরা চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে আসছিলেন।’

আহতদের পরিচয় : ট্রেন দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ৪১ জনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মিতু ও শাহিদা; বাকাইল গ্রামের সাহাবউদ্দিন, আখাউড়া উপজেলার লিটন ও সুরাইয়া; উপজেলার গোলখার গ্রামের বোরহান, বিজয়নগর উপজেলার দত্তখলা গ্রামের বৃষ্টি, আশুগঞ্জ উপজেলার তারুয়া গ্রামের শুভ, চাঁদপুরের তিরাশী গ্রামের মহিমা, সাতরাশি এলাকার রহিমা বেগম, সিলেটের রাহুল, বালাগঞ্জ উপজেলার রুবেল, জৈন্তাপুর উপজেলার আক্তার আলী, হবিগঞ্জের ধলা মিয়া ও হাসান আলী; নবীগঞ্জ উপজেলার আফসা, আসমা, আনোয়ারা ও মঈন উদ্দিন; বানিয়াচং উপজেলার সুব্রত রায়, মীম, নাজমা বেগম ও রেনু; চুনারুঘাটের রাজন, মনির, সহিদ জনি, বুল্লা গ্রামের আলমগীর, মুখলেছ, বানিয়ারা গ্রামের আশিক মিয়া, সৈয়দপুর গ্রামের রায়হান, খালিশপুর গ্রামের রাকিব (২৮), নারায়ণপুরের আবুল কালাম; কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বোরহান, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আবুল কাশেম, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ইমন ও সুমি; নোয়াখালীর সোনাপুর গ্রামের অলিউল্লাহ, মাইজদী এলাকার সুরাইয়া বেগম, বেগমগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের সৈকত ও গাজীপুরের ইমন।

তিনজন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে : মন্দবাগ রেলস্টেশনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে তিনজন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আবুল হাসান জানান, গতকাল সকালে আহত ১৩ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। এর মধ্যে আটজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। দুজনের অবস্থা কিছুটা গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসাধীন তিনজন হলেন হবিগঞ্জের আবদুল কামরুল (২৮), চাঁদপুরের হাইমচরের জাহাঙ্গীর (৪০) ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সোবহান (৪০)।

ট্যাগ: bdnewshour24 ট্রেন