banglanewspaper

জাকির হোসেন বেপারী ওরফে রাব্বী কখনও তৈরি পোশাক খাতের বড় কর্মকর্তা, কখনও ব্যাংকের এমডি কিংবা শিল্পপতি। তবে কথা-বার্তা কিংবা চালচলনে পরিপাটি রাব্বী এসবের কিছুই নন। কিন্তু ৩৪ বছরের এই যুবক এসব পরিচয় দিয়েই একে একে ২৮৭টি বিয়ে করেছেন!

পুলিশ জানিয়েছে, বিয়ে করে রাব্বী হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠিত নারীদের টার্গেট করতেন রাব্বী। প্রথমে বন্ধুত্ব তৈরি করতেন, পরে বিয়ে। কখনও আবার বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করেই লাপাত্তা হতেন। সহজ পথে না হলে ভয়-ভীতিও দেখাতেন রাব্বী। 

গত ২০ নভেম্বর রাব্বীকে রাজধানীর মণিপুরি পাড়া থেকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। রিমান্ডে থাকা রাব্বী এসব কথা জানিয়েছে পুলিশকে। শনিবার বিকেলে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম অর রশিদ তালুকদার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌফিক আহমেদ এসব তথ্য জানিয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিয়ে আর প্রতরণার মধ্যে দিয়েই চলছিল রাব্বীর জীবন। তিনি কোনো চাকরি করেন না। করেন না ব্যবসাও। তবুও চলাচল করেন দামি গাড়িতে। দামি দামি পোশাক পরিধান আর পটু কথায় ভোলাতেন নারীদের। অবশেষে, ২০ নভেম্বর আটকা পড়েন পুলিশের জালে।

যদিও এর আগে গত বছরের ৮ নভেম্বর মিরপুর মডেল থানায় এক তরুণীর দায়ের করা ধর্ষণের মামলায় ওই দিনই মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকা থেকে রাব্বীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর থানায় হাজির হন তাঁর প্রতারণার শিকার আরো চার নারী। তাঁরা সবাই চাকরিজীবী। তবে ওই মামলা থেকে জামিনে বের হয়ে ফের প্রতারণা চালিয়ে যান রাব্বী।

পুলিশ সূত্রে আরো জানা যায়, গত ২০ নভেম্বর শান্তা (ছদ্মনাম) নামের ২৬ বছর বয়সী এক নারী রাব্বীর বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় প্রতারণার একটি মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই তাঁকে রাজধানীর মণিপুরি পাড়া থেকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার করে আদালত তাঁর দুই দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এখন তিনি রিমান্ডে রয়েছেন। 

এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ অক্টোবর রাব্বী শান্তাকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠান। রিকোয়েস্ট গ্রহণ শেষে ১ নভেম্বর থেকে আসামির সঙ্গে শান্তার কথা শুরু হয়। পরে রাব্বী তাঁর পরিবারের শাপলা বেগম ও বোনদের সঙ্গে শান্তার কথা বলিয়ে দেন। একটা সময় পটু কথার মোহে পড়েন শান্তা। এরপর শান্তাকে দেওয়া হয় বিয়ের প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান তিনি।

এরপর ৭ নভেম্বর শান্তাকে তাঁর হোস্টেল থেকে শ্যামলী এলাকায় নিয়ে যান রাব্বী। তারপর আজ্ঞাতনামা দুজন আসামির (কাজী ও সাক্ষী) সহায়তা নিয়ে বিয়ের মিথ্যা কাবিননামা তৈরি করে শান্তাকে বিয়ে করেন রাব্বী। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে আসামি শান্তাকে তেজগাঁও থানাধীন ২৭ নম্বর মণিপুরি পাড়ার একটি রেস্টুরেন্টের নিচতলার বাঁ পাশের ছোট বেতের তৈরি রুমে নিয়ে যায়। তারপর তারা সেখানে খাওয়া-দাওয়া করেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে রাব্বী জোরপূর্বক তাঁকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগে বলা হয়।

এজাহারে আরো বলা হয়, ৭ নভেম্বরই আসামিসহ শান্তা নিজ গ্রামের বাড়ি গিয়ে তাদের বিয়ের কথা জানান। এরপর শান্তার বাবা নতুন জামাইকে আট আনা ওজনের ২৫ হাজার টাকা দামের একটি আংটি উপহার দেন। এ ছাড়া পোশাক বানানোর জন্য ২০ হাজার টাকাও দেন। পরে ১০ নভেম্বর তাঁরা দুজনই পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন।

ঢাকার আসার পর রাব্বী শান্তাকে কাজের কথা বলে নিবেদিকা নামের একটি ছাত্রী হোস্টেলে রেখে চলে যান। এরপর শান্তা রাব্বীকে আসতে বললেও নানা অজুহাতে তিনি আসেননি। পরে শান্তাকে রাব্বী জানান, তাঁর এক কোটি টাকা লোন হয়েছে, তা নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন। এভাবে কয়েকদিন পার হওয়ার পর আসামি শান্তাকে জানায়, তাঁর এক কোটি টাকা লোন পেতে আড়াই লাখ টাকা দরকার। কিন্তু তাঁর কাছে দুই লাখ আছে। বাকি ৫০ হাজার টাকা শান্তার বাবার কাছ থেকে যৌতুক দিতে বলেন রাব্বী। এরপর কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারেন না শান্তা। পরে ১৪ নভেম্বর রাব্বীকে শান্তাকে ঘুরতে নিয়ে বেরিয়ে আবার ধর্ষণ করেন।

এজাহার সূত্রে আরো জানা যায়, পরবর্তী সময়ে শান্তা বিয়ের কথা তাঁর অন্য বান্ধবীদের সঙ্গে বলেন। পরে শান্তার একজন বান্ধবী তাঁকে একটি ভিডিও দেখান। ভিডিওটি এনটিভির ক্রাইম ওয়ার্চ অনুষ্ঠানের ‘২৮৬ নারীকে বিয়ে করে প্রতারণা’ শিরোনামের। ভিডিও দেখে এবং পরবর্তী সময়ে খোঁজ-খবর নিয়ে শান্তা বুঝতে পারেন যে, আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং ধর্ষণের উদ্দেশে জাকির হোসেন ওরফে রাব্বী তাঁকে মিথ্যা কাবিননামা তৈরি করে বিয়ে করেন।

এসব ব্যাপারে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম অর রশিদ তালুকদার বলেন, ‘আসামি রাব্বী কখনও ভুয়া কাগজ তৈরি করে বিয়ে করতেন, কখনও আবার সত্যিই বিয়ে করতেন। বিয়ে করে নারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন। পরে তাদের আন্তরিক মুহূর্তগুলো ভিডিও করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিসহ পরিবেশ এমন করতেন যাতে নারীরাই সরে যেতে বাধ্য হতেন। এভাবে তিনি ২৮৭ জন নারীকে বিয়ে করেছেন বলে আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তৌফিক আহমেদ বলেন, ‘আসামি রাব্বী এখন রিমান্ডে আছেন। রিমান্ডে তিনি স্বীকার করেছেন, মূলত নারীর শরীরের প্রতি মোহ থেকে তিনি এসব করতেন। পরে বিয়ে করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করে চলে যেতেন। রাব্বীর অনেক স্ত্রীর সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। এর ভেতরে ১৪ জন স্ত্রীর কাবিননামাসহ কাগজপত্র আমাদের কাছে রয়েছে। এসব ঘটনা রাব্বী আমাদের কাছে স্বীকার করে নিয়েছেন। আসামির দেওয়া তথ্যে ভিত্তিতে শাপলা বেগম নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তিনি এখন কারাগারে আছেন।’

ট্যাগ: bdnewshour24 বিয়ে