banglanewspaper

মুনীর উদ্দিন আহমদ:

জমাট রক্তপিন্ড( clot) বা অন্য কোনো কারণে যদি মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বা বিঘ্ন ঘটে, তখন অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের অক্সিজেন বঞ্চিত অংশের সেল বা টিস্যু মারা যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্ট্রোক।

স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক একই কারণ ও প্রক্রিয়ায় হলেও দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। হার্ট অ্যাটাক হ্রতপিন্ড বা হার্টের রক্তনালির রোগ আর স্ট্রোক মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। আমরা অনেক সময় একটির সাথে অন্যটিকে গুলিয়ে ফেলি। আগে যেমন বলেছি, স্ট্রোক সাধারণত ঘটে যায় ব্লক সৃষ্টির ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের বিঘ্ন ঘটার কারণে বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়ার( rupture) ফলে রক্তক্ষরণের কারণে।

প্রতি ৪ মিনিটে স্ট্রোকে একজন রোগী মারা যায়। অবশ্য ক্যান্সার ও হার্ট অ্যাটাকের কারণে মৃত্যুহার আরও বেশি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। বিশ্বে প্রতি ৬ জনের মধ্যে একজন ক্যান্সারে মারা যায়। বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ মারা যায় হার্ট অ্যাটাকের কারণে।

হার্টে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি আর্টেরি বা রক্তনালি চর্বিযুক্ত প্ল্যাকের(plaque) কারণে সরু হওয়া, আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া হলো হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ। এর ফলে হার্টের পেশী পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না বলে অক্সিজেন ও পুষ্টিবঞ্চিত সেল বা পেশী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়।

এই অবস্থায় রক্ত সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য স্টেন্টিং বা রিং পরাতে হয় নতুবা বাইপাস সার্জারি করতে হয়। হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণের মধ্যে রয়েছে- পারিবারিক সম্পর্ক, স্থুলতা, ধূমপান, পর্যাপ্ত ব্যায়ামের অভাব, উচ্চ রক্তচাপ, খুব বেশি পরিমাণে ট্রান্স ফ্যাট খাওয়া, অত্যাধিক চর্বি, চিনি বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়া, কোমল পানীয় হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের একটি প্রধান কারণ, অধিক তাপে রান্না করা নষ্ট হয়ে যাওয়া কোলেস্টেরল গ্রহণ, ফ্রি রেডিক্যাল, ফ্রি রেডিক্যাল ধ্বংসকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অভাব, ডায়াবেটিস ও রক্তনালির প্রদাহ ও নানা সমস্যা।

প্রশ্ন হলো- হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কীভাবে কমাবেন? প্রথমত, লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনুন। সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। পুষ্টিকর সব কিছুই পর্যাপ্ত খাবেন। একদম বেশি খাবেন না, কমও না, সময় মেনে খাবেন, যখনতখন খাবেন না।

এক কাপ ভাত বা দুটো রুটি বা দুই পিস পাউরুটি খাবেন, ভাত, রুটি, কোমল পানীয় বা চিনি জাতীয় খাবার বেশি খেয়েছেন তো মরেছেন, তেল কম খাবেন, পোড়া তেলে রান্না করা খাবার একদম বন্ধ করুন, কোমল পানীয় বর্জন করুন, ধূমপান পরিহার করুন, প্রচুর প্রাকৃতিক প্রিবায়োটিকস (যেমন আঁশ, যা শরীরের উপকারী জীবাণুর বয়োঃবৃদ্ধির জন্য দরকার) ও প্রোবায়োটিক (যেমন দই, যাতে শরীরের জন্য অত্যাবশকীয় জীবাণু রয়েছে) খাবেন, সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট জোরে হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন, দিনে অন্তত ৩ লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করুন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, রাস্তাঘাটের অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করুন, প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খান, ট্রান্স ফ্যাট খাওয়া বন্ধ করুন, আপনার শরীরের জন্য অত্যাবশকীয় কোলেস্টেরলকে উচ্চ তাপে রান্না করে নষ্ট করে খাবেন না, গরুর গোস্ত ও খাসির গোস্ত খাওয়া কমিয়ে দিন বা বন্ধ করুন, ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন, পারিবারিক সম্পর্ক সুন্দর রাখুন, মনে রাখবেন- স্বামী-স্ত্রীর পর্যাপ্ত সুখকর যৌণমিলন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমাতে সাহায্য করে, মানসিক অশান্তি, দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও চাপ কমান এবং দিনে ৭ ঘন্টা ঘুমান(sound sleep)। আর আপনার শরীরের ওজন ঠিক রাখতে ভুলবেন না।

বাকি রইল এবাদত। আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করুন ও সুস্থ থাকার জন্য তাঁর কাছে সাহায্য কামনা করুন। আশা করি এতে করে নিশ্চয়ই আপনি ভালো থাকবেন।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ,

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

drmuniruddin@gmail.com

ট্যাগ: bdnewshour24 স্ট্রোক হার্ট অ্যাটাক