banglanewspaper

বশেমুরবিপ্রবির প্রতিনিধি: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নোয়াখালী জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা হাতিয়ার রামগতিতে গড়ে ওঠা ২নম্বর সেক্টরে  পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী যুবক  এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান,বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ওয়ালীউল্যাহ, মুক্তিযোদ্ধা নজরুল মাস্টার,মরহুম মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার ডাক্তার সহ আরও অনেকে মিলে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন।এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান ফরেস্টের চাকরির সুবাদে অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন।তাই তিনি অল্প বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় হাতিয়া-রামগতি অঞ্চলের বিএলএফ অধিনায়ক ছিলেন মোশারফ হোসেন। সহ-অধিনায়ক ছিলেন শাহ আব্দুল মাজেদ। রামগতি থানার অধিনায়ক ছিলেন মোঃ ফেরদৌস, হাতিয়া থানার অধিনায়ক ছিলেন অধ্যাপক ওয়ালিউল্যাহ ও মোঃ রফিকুল আলম। সহ রাজনৈতিক প্রধান ছিলেন কাজী আওরঙ্গজেব ও সহ  গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন মরহুম  নিজামউদ্দিন। 

যুদ্ধকাকালীন সময়ে হাতিয়া থানা সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ছিলেন এডভোকেট কামাল উদ্দিন আহম্মেদ। হাতিয়া থানায় ১১ জন সদস্যের একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সহসভাপতি মরহুম আমির হোসেন মাষ্টার, সাধারণ  সম্পাদক ছিলেন এডভোকেট দেলোওয়ার হোসেন, অন্যতম সদস্য মরহুম নুর ইসলামসহ কয়েকজন আওয়ামীলীগ সদস্য মিলে মরহুম মৌলভী সফিকের বাসায় এই সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য হাতিয়া থেকে প্রথম ২৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে হাতিয়ায় যোগদান করে। এদের নের্তৃত্বে ছিলেন মোঃ রফিকুল আলম। পরবর্তী পর্যায়ে অধ্যাপক ওয়ালিউল্যাহ একটি টিম নিয়ে হাতিয়াতে যুদ্ধের নের্তৃত্ব দেন।এই টিমের একজন অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান।

মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট দেলোয়ার হোসেন এর বাড়ি সহ কিছু হিন্দু বাড়ি পুরিয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সদস্যদের তৎপরতা ছিল ব্যাপক। এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান সহ তার সহযোদ্ধারা তখন পলাতক হিসেবে রামগতিতে অবস্থান করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তৎকালীন অয়ার্ড মেম্বার হাজী শামসুল হক ছিলেন শান্তিকমিটির সভাপতি এবং শান্তিকমিটির সেক্রেটারি ছিলেন বাশার। শামসুল হক ও বাশার সহ মোট ৪ জন রাজাকারকে সাগরিয়া বাজারে পিটিয়ে আধামরা করে তলপেটে গুলি করে মেরে ফেলেন।এ ছাড়াও তিনি ফরেস্টের চাকরি করতেন।সেই সুবাদে তার অস্ত্র চালনায় ছিল ভাল দক্ষতা  ।তাই তিনি অল্প বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণও দিতেন।পরবর্তীতে হাতিয়ার ওসখালীতে ক্যাম্প করেন তিনি এবং তার সহযোদ্ধারা।সেখানেই তিনি অল্প বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের ২ মাস ট্রেনিং দেন।

মূলত এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান ১৯৫১ সালের আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। চাকরির সুবাদে তিনি ১৯৭১ সালে হাতিয়ার রামগতিতে যান এবং সেখান থেকেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করেন। সনদ নাম্বার ১৬৯১৭৪। স্থায়ী ঠিকানা বরিশালে হওয়ায় যুদ্ধকালীন সময় তিনি হাতিয়ার থানা কমান্ডার অধ্যাপক ওয়ালিউল্যাহর নিকট যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রমাণ স্বরুপ কিছু ডকুমেন্ট চান।অধ্যাপক ওয়ালিউল্যাহ ১৯৭২ সালে তাকে মুজিব বাহিনীর সিল সহ একটি প্রত্যয়নপত্র দেন।

প্রত্যয়নপত্রে লেখা ছিল-

আমি এই পরিচয়পত্র দিতেছি যে এ বি এম সিদ্দিকুর রহমান পিতা মো. জজ আলী হাওলাদার সাং নদমুলা থানা ভান্ডারিয়া জিলা বরিশাল (বাংলা দেশ)।আমি উক্ত লোককে ভাল ভাবে ছিনি। তিনি প্রায় গত তিন বৎসর ধরিয়া এখানে বসবাস করিয়া আসিতেছেন। উক্ত লোক আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আমাদের স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সহোযোগিতায় ছিলেন।অতএব বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকারে তাহাকে যোগ্যতানুসারে চাকুরী দেওয়ার মর্জি হয়।তার মংগল কামনা করি।

২০১০ সালে তিনি গ্যাজেট হওয়ার জন্য কেন্দ্রে দরখাস্ত করেন।অতপর যাচাই করার জন্য তার ডকুমেন্টস নোয়াখালির ডিসির কাছে পাঠানো হয়।
নোয়াখালির ডিসি হাতিয়ার টিওনো এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে যাচাই করার জন্য দ্বায়িত্ব দেন।তবে স্থায়ী ঠিকানা অন্যত্র হওয়ায় কেন্দ্রের আদেশ আসেনি।এর ফলে তারা যাচাই বাছাই করতে সক্ষম হননি। এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমানের সহযোদ্ধাদের মধ্যে বেচে আছেন গোলাম মাওলা,দিদারুল ইসলাম খান,নিজামুদ্দিন,ইউনুস সহ আরও অনেকে।তারা সকলেই  এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুবাদে তারা  এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমানকে ওস্তাদ বলে সম্মোদন করেন।

এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান দুঃখের সাথে বলেন, আমার ভাতা লাগবে না। আমি দেশের জন্য যে অবদান রেখেছি তার স্বীকৃতি পেয়ে মরতে চাই।জানি না কতদিন বেচে থাকব। তবে আমি যে একজন মুক্তিযোদ্ধা সেটার স্বীকৃতি পাওয়াটাই আমার শেষ ইচ্ছা।

উল্লেখ্য,  এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাস ভবনে তার তথ্য প্রমাণ নিয়ে যাবেন বলে জানান।

ট্যাগ: bdnewshour24 মুক্তিযোদ্ধা